জনগণের ভোট হোক জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের একমাত্র মাপকাঠি
দলীয় দাসত্বের মনোনয়ন বাণিঞ্জ্য বনাম গণআকাঙ্ক্ষার রাজনীতিএম গফুর উদ্দিন চৌধুরী:গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হলো জনগণ। রাষ্ট্র পরিচালনার চূড়ান্ত ক্ষমতা জনগণের হাতে ন্যস্ত থাকবে—এটিই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার আদি ও অসল কথা। কিন্তু বাস্তব রাজনীতিতে প্রায়শই দেখা যায়, জনগণের সেই ক্ষমতার ওপর ভর করে একদল সুবিধাবাদী ও গণবিচ্ছিন্ন নেতার উত্থান ঘটে। যে ব্যক্তি বা গোষ্ঠী জনগণের প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস রাখতে পারে না, তারা স্বভাবতই জনগণকে বাদ দিয়ে দলীয় হাইকমান্ড বা শীর্ষ নেতাদের মন জয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। দলীয় প্রতীক, মনোনয়ন বাণিজ্য এবং অভ্যন্তরীণ স্বৈরতন্ত্রের চাদরে ঢেকে দেওয়া হয় জনগণের মৌলিক ভোটাধিকার। সম্প্রতি রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপি সরকারের পক্ষ থেকে দলীয় প্রতীক বাতিল করে নিরপেক্ষ নির্বাচনের ঘোষণা দেওয়া সত্ত্বেও যখন তৃনমূল পর্যায়ে মনোনয়ন বাণিজ্যের অভিযোগ ওঠে, তখন তা পুরো গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ওপর একটি বড় প্রশ্নচিহ্ন ছুড়ে দেয়। এই প্রেক্ষাপটে আজ অপরিহার্য হয়ে উঠেছে একটি স্লোগান—’জনগণের ভেটোই হোক জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের একমাত্র মাপকাঠি’।দলীয় প্রতীক বাতিল ও বর্তমান বাস্তবতাএকটি সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরির লক্ষ্যে বিগত অর্ন্তবর্তীকালীন সরকার স্থানীয় পর্যায়ে দলীয় প্রতীক বাতিল করে নিরপেক্ষ নির্বাচনের যে ঘোষণা দিয়েছিল, বর্তমান বিএনপি সরকার ও নির্বাচন কমিশন তা নীতিগতভাবে মেনে নিয়েছে যা সত্যিই প্রশংসনীয়। দলীয় প্রতীক বাতিলের মূল উদ্দেশ্যই ছিল রাজনীতিকে দলীয় বৃত্তের বাইরে এনে ব্যক্তিযোগ্যতা ও জনপ্রিয়তার ওপর প্রতিষ্ঠিত করা। প্রতীক না থাকলে প্রার্থীরা মার্কা ভাঙিয়ে পার পেয়ে যেতে পারবে না, বরং তাদের নিজস্ব পরিচয় ও কাজের হিসাব নিয়ে জনগণের কাছে যেতে হবে।কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, সরকারের এই ইতিবাচক ঘোষণার পরও মাঠপর্যায়ে এক শ্রেণির নেতার চরিত্র বদলায়নি। প্রতীক বাতিলের পরও পর্দার আড়ালে চলছে ‘নমিনেশন বাণিজ্য’। অজনপ্রিয়, অর্থবিত্তের মালিক ও চাটুকারদের দলীয় আশীর্বাদপুষ্ট করার এই প্রক্রিয়া প্রমাণ করে যে, দলীয় সংস্কারের কথা বলা হলেও ভেতরের পচন এখনো পুরোপুরি দূর হয়নি। প্রশ্ন জাগে—যদি নির্বাচন নিরপেক্ষই হয় এবং দলীয় প্রতীক নাই থাকে, তবে কেন এখনো নেতাদের ড্রয়িংরুমে মনোনয়নের বাণিজ্য চলবে? কেন অজনপ্রিয় ব্যক্তিদের দলের পক্ষ থেকে প্রচ্ছন্ন সমর্থন দিয়ে জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে? এই দ্বিচারিতা গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে।জনগণের প্রতি আস্থাহীনতা ও মনোনয়ন পাগল রাজনীতিরাজনীতিতে যখন কোনো নেতা বা দলের তৃণমূলের ওপর আস্থা হারিয়ে যায়, তখন তারা বিকল্প পথের সন্ধান করে। জনগণের ভালোবাসা ও সমর্থনের চেয়ে তাদের কাছে তখন মুখ্য হয়ে ওঠে দলীয় লেজুড়বৃত্তি। যে নেতা জানেন যে সাধারণ মানুষ তাকে ভোট দেবে না, তার একমাত্র লক্ষ্য থাকে যেকোনো উপায়ে দলের শীর্ষ নেতৃত্বকে সন্তুষ্ট করে একটি ‘মনোনয়ন’ বা ‘টিকিট’ বাগিয়ে নেওয়া। এই মনোনয়ন পাওয়ার জন্য তারা লবিং, অর্থ লেনদেন এবং নানামুখী তদবিরে মেতে ওঠে। একেই বলা হয় ‘মনোনয়ন পাগল’ রাজনীতি। এই প্রবণতা প্রমাণ করে যে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা রাজনীতিকে জনসেবার মাধ্যম হিসেবে না দেখে, ক্ষমতা ও অর্থ উপার্জনের একটি লাইসেন্স হিসেবে বিবেচনা করছেন। জনগণের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন এই নেতারা মনে করেন, দলীয় টিকিট পেলেই ক্ষমতার চেয়ার নিশ্চিত, তাই জনগণের দ্বারে যাওয়ার কোনো প্রয়োজন তারা বোধ করেন না।অধিকার হরণ ও অভ্যন্তরীণ স্বৈরতন্ত্রদলের ভেতরে যখন গণতন্ত্র চর্চা না হয়ে একনায়কতন্ত্র ভর করে, তখন তৃণমূলের ত্যাগী ও জনপ্রিয় নেতাদের অধিকারকে গলাটিপে হত্যা করা হয়। অনেক সময় দেখা যায়, একটি নির্দিষ্ট এলাকায় বছরের পর বছর ধরে জনগণের সুখ-দুঃখে পাশে থাকা জনপ্রিয় নেতাকে বাদ দিয়ে কেন্দ্র থেকে এমন একজনকে মনোনয়ন দেওয়া হয়, যাকে এলাকার মানুষ চেনেই না। এই মনোনয়ন প্রক্রিয়ার পেছনে কাজ করে গোপন আঁতাত ও আর্থিক সুবিধা। যখন একজন অযোগ্য বা গণবিচ্ছিন্ন ব্যক্তিকে চাপিয়ে দেওয়া হয়, তখন তা কেবল দলের ভেতরের যোগ্য প্রার্থীদের অধিকার হরণ করে না, বরং পুরো এলাকার ভোটারদের অধিকারকেও খর্ব করে। এটি এক ধরনের রাজনৈতিক অপরাধ, যেখানে জনগণের ইচ্ছাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে একজনের পকেট ভারী করার ব্যবস্থা করা হয়।দুই দলের দুই চিত্র: জনগণের দুয়ার বনাম নেতাদের ড্রয়িংরুমবর্তমান রাজনৈতিক মাঠে প্রার্থীদের আচরণের মধ্যে একটি স্পষ্ট বিভাজন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বর্তমান বিরোধী দলের সমর্থিত প্রার্থীরা, যারা নিজেদের জনপ্রিয়তা যাচাই ও জনগণের ওপর আস্থা অর্জনের লক্ষ্যে, ভোটারদের দ্বারে দ্বারে যাচ্ছেন। তারা প্রত্যন্ত অঞ্চলে ঘুরে ঘুরে মানুষের অভাব-অভিযোগ শুনছেন, ভোটারদের মন জয় করার চেষ্টা করছেন। এটিই হয়তো প্রকৃত রাজনীতির রূপ হওয়া উচিত।অন্যদিকে, বিপুল জনপ্রিয় সরকারী দলের কিছু কিছু গণবিচ্ছিন্ন প্রার্থীরা ভোটারদের কাছে যাওয়ার কোনো প্রয়োজনই মনে করছেন না। তারা দিন-রাত পার করছেন দলের প্রভাবশালী নেতাদের কার্যালয় ও ড্রয়িংরুমে। নেতাদের মন জয় করতে পারলেই যেন তাদের বৈতরণী পার হওয়া সম্ভব—এমন একটি ধারণা তাদের গ্রাস করেছে। এই গণবিচ্ছিন্ন প্রার্থীরা মনে করেন, জনগণের ভোটের চেয়ে নেতাদের ‘আশীর্বাদ’ অনেক বেশি শক্তিশালী। এই মানসিকতা একটি সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য চরম হুমকিস্বরূপ।মনোনয়ন বাণিজ্য: গণতন্ত্রের ক্যানসারমনোনয়ন বাণিজ্য হলো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার একটি মরণব্যাধি বা ক্যানসার। যখন অর্থের বিনিময়ে বা স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে মনোনয়ন কেনাবেচা হয়, তখন রাজনীতির গুণগত মান তলানিতে গিয়ে ঠেকে। একজন ব্যবসায়ী বা চোরাকারবারি যখন বিপুল অর্থের বিনিময়ে দলের মনোনয়ন কিনে নেন, তখন নির্বাচিত হওয়ার পর তার মূল লক্ষ্য থাকে বিনিয়োগ করা অর্থ সুদ-আসলে উসুল করা। ফলে জনকল্যাণমূলক কাজ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় এবং দুর্নীতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয়। মনোনয়ন বাণিজ্যের কারণে সৎ, শিক্ষিত এবং দেশপ্রেমিক তরুণরা রাজনীতিতে আসার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। এর ফলে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব চলে যায় দুর্বৃত্তদের হাতে, যা একটি জাতির ভবিষ্যৎকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেয়।জনগণের ভেটো: জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের চূড়ান্ত হাতিয়ারএই রাজনৈতিক অচলাবস্থা এবং দলীয় দাসত্ব থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় হলো ‘জনগণের ভেটো’ বা প্রত্যাখ্যানের ক্ষমতা। ব্যালট পেপারে যদি ‘না ভোট’ বা প্রবাসীদের মতো সরাসরি প্রার্থী প্রত্যাখ্যানের শক্তিশালী আইনি কাঠামো থাকে, তবে দলগুলো আর অযোগ্য প্রার্থী দেওয়ার সাহস পাবে না। জনগণের ভেটো দেওয়ার অর্থ হলো—”তোমাদের চাপিয়ে দেওয়া অযোগ্য ও দুর্নীতিবাজ প্রার্থীকে আমরা গ্রহণ করলাম না।”জনপ্রতিনিধি হতে হবে তাকেই, যাকে জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে গ্রহণ করবে। কোনো দলের চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্ত বা নমিনেশনের মোড়কে আসা কোনো ব্যক্তি জনগণের প্রতিনিধি হতে পারেন না। ভোটারদের সচেতন হতে হবে এবং দলীয় অন্ধত্ব সরিয়ে রেখে প্রার্থীর সততা, যোগ্যতা ও জনঘনিষ্ঠতাকে প্রাধান্য দিতে হবে। নেতারা মনোনয়ন দিলেও জনগণ যদি ভোটের মাধ্যমে সেই অযোগ্য প্রার্থীকে ‘ভেটো’ বা প্রত্যাখ্যান করে, তবেই দলগুলো ভবিষ্যতে মনোনয়ন বাণিজ্য করা থেকে বিরত থাকবে।একটি রাজনৈতিক দলের তৃণমূল পর্যায়ে সফলতা এবং জনসমর্থন ধরে রাখার প্রধান চাবিকাঠি হলো যোগ্য, সৎ ও সর্বমহলে গ্রহণযোগ্য প্রার্থী নির্বাচন করা।সারাদেশে যদি সরকারী দলের নীতিনির্ধারণী মহল জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য প্রার্থী সমর্থন করতে ব্যর্থ হন, তবে তার পরিণতি দলের জন্য বিপর্যয়কর হতে পারে। মনোনয়ন বাণিজ্যের বিস্তার ঘটলে নির্বাচনে দলের ভরাডুবি অবধারিত হয়ে পড়ে। কারণ, আধুনিক সচেতন ভোটাররা কেবল দলীয় প্রতীক দেখে নয়, প্রার্থীর অতীত রেকর্ড ও সততা বিবেচনা করে ভোট দেন। অতএব, বিএনপির রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষা এবং আগামী নির্বাচনে জয় নিশ্চিত করতে হলে ক্ষমতাসীনদলকে ব্যক্তি স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে মাঠপর্যায়ের জরিপ অনুযায়ী যোগ্য প্রার্থীকে সমর্থন দিতে হবে। মনোনয়ন বাণিজ্যের কলঙ্ক দূর করে জনবান্ধব প্রার্থী বাছাই করতে না পারলে যেকোনো বড় রাজনৈতিক জোটেরই নির্বাচনী ভরাডুবি নিশ্চিত।রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু হতে হবে দেশের সাধারণ মানুষ, কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের কার্যালয় বা নেতাদের ড্রয়িংরুম নয়। দলীয় প্রতীক বাতিল ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের যে সুযোগ তৈরি হয়েছে, তাকে সফল করতে হলে মনোনয়ন বাণিজ্যের এই দুষ্টচক্রকে কঠোর হস্তে দমন করতে হবে। যে প্রার্থীরা জনগণের মন জয় না করে নেতাদের তোষামোদিতে ব্যস্ত, তাদের রাজনীতি থেকে চিরতরে বিদায় দেওয়ার সময় এসেছে। জনগণের জাগ্রত বিবেক এবং ভোটের অধিকারই পারে এই ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে। দলীয় মনোনয়নের চেয়ে জনগণের আস্থাই হোক শেষ কথা। জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণ এবং ভেটো প্রয়োগের মাধ্যমেই কেবল একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক ও শোষণমুক্ত রাষ্ট্র গঠন সম্ভব।লেখক: মানবাধিকার ব্যক্তিত্ব, সিনিয়র সহ-সভাপতি বাংলাদেশ ইউনিয়ন পরিষদ ফোরাম কেন্দ্রীয় কমিটি ও চেয়ারম্যান পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদ, উখিয়া, কক্সাজার।