মুসলিম উদ্দিন :
কক্সবাজারের উখিয়ার সীমান্তবর্তী সাধারণ কৃষকদের বুকফাটা হাহাকার আর তীব্র ক্ষোভের মুখে পড়েছে উখিয়া উপজেলা কৃষি বিভাগ। সাধারণ কৃষকদের সরাসরি অভিযোগ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কামনাশিস্ সরকারের রহস্যজনক নীরবতা এবং প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদে, অন্যান্য কৃষি কর্মকর্তাদের হাত ধরে প্রতিনিয়ত রাষ্ট্রীয় সার পাচার হয়ে যাচ্ছে মিয়ানমারে! একদিকে সারের এই চোরাচালান, অন্যদিকে সরকারি অনুদান ও কৃষি উপকরণ সাধারণ কৃষকদের না দিয়ে লুটেপুটে আত্মসাৎ করার এক ভয়ঙ্কর চক্র গড়ে উঠেছে উখিয়ায়। মাঠপর্যায়ের কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, সরকারি খাতায় উখিয়া উপজেলার জন্য বিপুল পরিমাণ বীজ, চারা, সার ও কৃষি উপকরণ বরাদ্দ এলেও বাস্তবে তার কোনো ছিটেফোঁটাও পান না প্রকৃত চাষিরা।
হলদিয়াপালং ইউনিয়নের রেঙ্গুরবিল এলাকার প্রবীণ কৃষক উলা মিয়া দীর্ঘ সাড়ে চার দশকের বঞ্চনার চিত্র তুলে ধরে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "আমরা বাপদাদার আমল থেকে এই মাটিতে ঘাম ঝরাচ্ছি। গত ৪০-৪৫ বছর ধরে কৃষি কাজ করছি, কিন্তু আজও সরকারি খাতায় আমাদের নাম ওঠেনি। আমাদের কপালে কোনোদিন এক ছটাক সরকারি সাহায্যও জোটেনি। আসলে কৃষি অফিসের এসব সহযোগিতা কারা পায়, কাদের জন্য আসে তা একমাত্র উপরওয়ালাই জানেন আর এই কৃষি কর্মকর্তারাই ভালো বলতে পারবেন!"
একই ইউনিয়নের ১ নং ওয়ার্ডের মধুঘোনা এলাকার দীর্ঘ ৩০ বছরের অভিজ্ঞ কৃষক আবদুল নবী বলেন, "আমি কৃষি কাজ করেই জীবন চালাই। আজ দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে এই পেশায় আছি, কিন্তু এই পর্যন্ত কোনোদিন আমাদের এলাকায় বা মাঠে কৃষি বিভাগের কোনো কর্মকর্তাকে দেখিনি। সরকারি সহযোগিতা কিংবা অনুদান পাওয়া তো দূরের কথা, কোনো ধরনের পরামর্শ দিতেও কেউ কখনো আসেনি। সব কৃষি উপকরণ ও সরকারি বরাদ্দ উখিয়া কৃষি অফিসের কর্মকর্তারা নিজেরাই লুটপাট করে আত্মসাৎ করে ফেলছেন।"
অনুরূপ বঞ্চনা আর ক্ষোভের চিত্র ফুটে উঠেছে হলদিয়াপালং ইউনিয়নের উত্তর বড় বিল এলাকার প্রবীণ কৃষক বাচা মিয়া ও রহিম উল্লাহর কণ্ঠে তারা বলেন, "কৃষি উপকরণ বা কৃষি অনুদানের কথা বাদই দিলাম, হলদিয়া ইউনিয়ন কিংবা পুরো উখিয়া উপজেলায় কৃষি কর্মকর্তা হিসেবে কে দায়িত্বে আছেন, তাকে আজ পর্যন্ত চোখেই দেখিনি। লোকমুখে শুনি সরকার কৃষকদের নানা প্রণোদনা দেয়, কিন্তু তারা এগুলো কোথায়, কার কাছে বিতরণ করে তা আল্লাহই ভালো জানেন। মাঝে মধ্যে লোকদেখানো বিতরণের অনুষ্ঠান ও ছবি তোলার আয়োজন করা হয়। এর পরবর্তী অবশিষ্ট বরাদ্দগুলো পরে দেওয়া হবে বলা হলেও বাস্তবে তা আর বিতরণ করা হয় না। আসল কৃষকদের কপালে কোনোদিন এক ছটাক সরকারি সাহায্য জোটে না।"
শুধু হলদিয়াপালং নয়, জালিয়া পালং ইউনিয়নের ইনানী এলাকার কৃষক রফিক উল্লাহ ও মফিদুল আলমের দাবিও একই রকম। তারা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "উখিয়া উপজেলায় কৃষি কর্মকর্তা বা কৃষকপ্রেমী কোনো মানুষ দায়িত্বে আছে বলে আমাদের মনে হয় না। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের এই সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি এবং উদাসীনতার কারণেই চোরাকারবারিরা আজ বেপরোয়া।"
মাঠপর্যায়ের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও উখিয়ার প্রান্তিক কৃষকদের বঞ্চনার চিত্র ফুটে উঠেছে। এই প্রতিবেদকের নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে "উখিয়ার এমন কোনো সাধারণ বা প্রান্তিক কৃষক আছেন, যিনি এই পর্যন্ত কৃষি অফিস থেকে কোনো ধরনের সরকারি সহযোগিতা, প্রণোদনা কিংবা পরামর্শ পাননি?" এমন এক পোস্টের পর মন্তব্যে ক্ষোভ প্রকাশ করেন শত শত ভুক্তভোগী ও সচেতন নাগরিক।
রাজাপালং ইউনিয়নের হিজলিয়া গ্রামের ডিপ্লোমা কৃষিবিদ মো. জাহাঙ্গীর আলম জানান, তাঁর বাবার মৃত্যুর পর তিনি প্রায় ৩ বিঘা জমি চাষবাস করলেও আজ পর্যন্ত কোনোদিন সরকারি কোনো সহযোগিতা বা প্রণোদনা পাননি। প্রবীণ কৃষক প্রসেনজিৎ বড়ুয়া তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে লেখেন, তাদের দাদার বাড়িতে প্রতি মৌসুমে ৮ থেকে ১০ কানি জমি চাষ হলেও আজ পর্যন্ত তারা সরকারি সুযোগ-সুবিধা পাননি। রহস্যজনকভাবে এসব সরকারি সার কোথায় যাচ্ছে? এমন প্রশ্ন তোলেন তিনি। মোশতাক চৌধুরী নামের স্থানীয় এক বাসিন্দা জানান, তাদের এলাকায় বিপুল সংখ্যক মানুষ চাষাবাদ করলেও কেউ কখনো সরকারি সাহায্য পাননি। অন্যদিকে আবুল মনসুর মুন্না লেখেন, এলাকার অধিকাংশ কৃষক সরকার যে কৃষি খাতে সহযোগিতা দেয় সে বিষয়েই কিছু জানেন না। এছাড়াও সামাজিক মাধ্যমে মন্তব্যের ঘরে অসংখ্য প্রান্তিক চাষি বছরের পর বছর বংশপরম্পরায় চাষাবাদ করলেও কৃষি দপ্তরের কোনো কর্মকর্তা কখনো তাদের পরামর্শ বা সাহায্য নিয়ে পাশে দাঁড়ায়নি বলে ক্ষোভ জানান।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন অভিযানের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, উখিয়া সীমান্ত দিয়ে মিয়ানমারে সার পাচারের ক্ষেত্রে মূলত পালংখালী ইউনিয়নের কয়েকটি স্থান বারবার সামনে এসেছে। এর মধ্যে ধামনখালী ও রহমতের বিল এলাকা দিয়ে রাতের আঁধারে নাফ নদী পার করে বা সীমান্ত রেখা ব্যবহার করে সার ওপারে পাঠানো হয়। এছাড়া আঞ্জুমান পাড়া, বালুখালী সীমান্ত এবং দুর্গম পাহাড়ি পথ হওয়ার সুযোগে থাইংখালী ও তেলখোলা সীমান্ত পথগুলোকে চোরাকারবারিরা নিরাপদ পথ হিসেবে ব্যবহার করছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, মিয়ানমারে সারের তীব্র সংকট এবং চড়া দাম থাকার সুযোগ নিয়ে উখিয়ার স্থানীয় কিছু চক্র সরকারি ভর্তুকির সার অবৈধভাবে সংগ্রহ করে ওপারে পাচার করে থাকে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ২১ জুলাই পর্যন্ত উখিয়া সীমান্ত এলাকা থেকে মোট ৩৮৩ বস্তা পাচারকৃত সার উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে উখিয়া থানা পুলিশ ০১টি মামলায় ৫৪ বস্তা এবং বিজিবি ১৯টি মামলায় ৩২৯ বস্তা সার উদ্ধার করে।
তাছাড়া, গত রবিবার (০৫ জুলাই) রাত আনুমানিক ১১টার দিকে পালংখালী গয়ালমারা এমএসএফ হাসপাতালের ব্রিজের পাশে ২৪০ বস্তা সার মিয়ানমারে পাচারের উদ্দেশ্যে মজুদ করা হয়েছিল। প্রান্তিক কৃষকেরা যখন এক বস্তা সারের জন্য ডিলারের দ্বারে দ্বারে ঘুরেও খালি হাতে ফিরছেন, তখন শত শত বস্তা সার বর্ডারের এত কাছে স্তূপ করে রাখার দুঃসাহস এই চোরাকারবারিরা পায় কোথায়? এমনটাই প্রশ্ন সচেতন মহলের। ভুক্তভোগী কৃষকদের দাবি, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কামনাশিস্ সরকারের এই প্রকাশ্য নীরবতা মূলত পাচারকারী চক্রকে সবুজ সংকেত দেওয়ার শামিল।
এসব গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে উখিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কামনাশিস্ সরকার তাঁর লিখিত বক্তব্যে অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ অস্বীকার করে বলেন, "আপনার বক্তব্যটি সঠিক নয়। কৃষি কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে উপজেলা প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও স্থানীয় মানুষের সহযোগিতায় তথ্যের ভিত্তিতে পাচারের উদ্দেশ্যে রাখা কয়েকটি সার, তেলসহ অন্যান্য নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের চালান জব্দ করা হয়েছে এবং এ সংক্রান্ত মামলা চলমান আছে। আমরা স্থানীয় জনগণসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সকলের সহযোগিতা নিয়ে কাজ করে যাচ্ছি।"
সরকারি প্রণোদনা আত্মসাৎ ও প্রকৃত কৃষকদের বঞ্চিত করার অভিযোগের জবাবে তিনি ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, "প্রণোদনায় প্রান্তিক কৃষকরা বঞ্চিত হচ্ছে—এ বিষয়টিও সঠিক নয়। এ উপজেলায় ৩০-৪০ হাজার কৃষক পরিবার আছে এবং এই সংখ্যাটা প্রতি বছর বাড়ছে। কিন্তু আমাদের প্রণোদনা প্রতিবছর গড়ে মাত্র ২-৩ হাজার উপকারভোগীর জন্য আসে। তাহলে একসাথে এতজন কৃষক বা উপকারভোগীকে কীভাবে দেওয়া সম্ভব? যেহেতু বরাদ্দ কম আসছে এবং এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া, কাজেই আমরা ধাপে ধাপে সবাইকে দেওয়ার চেষ্টা করছি।"
তিনি আরও জানান, আগ্রহী কৃষকেরা চাইলে তাদের তথ্য অফিসে বা উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার নিকট জমা দিয়ে রাখতে পারবেন। এবার যারা পায়নি, তারা সামনের বার পাবে; আর যারা এবার পেয়েছে, তারা সামনের বার পাবে না। এভাবেই এই কার্যক্রমের স্বচ্ছতা বজায় রেখে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। একই সাথে তিনি জানান যে, উপজেলার সার তদারকি ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হয়েছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বরাদ্দের স্বচ্ছতার দাবি করলেও বাস্তবে কারা এই সুবিধা পাচ্ছেন, তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েই গেছে। এই প্রতিবেদকের পক্ষ থেকে উখিয়া কৃষি কর্মকর্তার কাছে চলতি অর্থ বছরের সরকারি সুবিধা ও প্রণোদনা পাওয়া উপকারভোগী কৃষকদের প্রকৃত তালিকা চেয়ে বার্তা পাঠানো হলেও, প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত সেই তালিকা সরবরাহ করা হয়নি।
এদিকে উখিয়া কৃষি বিভাগের এই অনিয়ম ও সার পাচারের মতো স্পর্শকাতর অভিযোগটি এখন সরকারের উচ্চ মহলের নজরে এসেছে। এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র তথ্য অফিসার মোহাম্মদ জাকির হোসেন জানান, "এমন গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে আমরা খতিয়ে দেখছি এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"
মন্ত্রণালয়ের এই আশ্বাসের পর উখিয়ার ভুক্তভোগী কৃষক সমাজ ও সচেতন মহল আশা করছেন, একটি উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে এই সার পাচার চক্র ও অনুদান হরিলুটের প্রকৃত সত্য উদঘাটিত হবে এবং দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে।