চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে একটি জাহাজ ভাঙা কারখানায় (শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড) পুরোনো জাহাজ কাটার সময় বিষাক্ত গ্যাসে ৯ শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। শুক্রবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে ভাটিয়ারি ইউনিয়নে অবস্থিত ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং শিপইয়ার্ডে এলএনজি স্ক্র্যাপ জাহাজে এ দুর্ঘটনা ঘটে।
গ্যাস-মুক্ত না করে এবং নিরাপত্তা সরঞ্জাম ছাড়াই শ্রমিকদের জাহাজ কাটার কাজে লাগানোর কারণেই প্রাণহানির এ ঘটনা ঘটেছে বলে ফায়ার সার্ভিসসহ সংশ্লিষ্টরা অভিযোগ করেছে।
দুর্ঘটনার পর ইয়ার্ডের গেট বন্ধ করে দেওয়া এবং ফায়ার সার্ভিসকে প্রায় ২ ঘণ্টা পর খবর দেওয়া হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। এ কারণে তাৎক্ষণিকভাবে কেউ শ্রমিকদের উদ্ধারের জন্য যেতে না পারায় হতাহতের সংখ্যা বেড়েছে বলে দাবি করেছেন স্থানীয়রা।
তারা বলছেন, প্রায় প্রত্যেকটি শিপইয়ার্ড কর্তৃপক্ষ দুর্ঘটনা ঘটলে প্রথমে তা লুকানোর চেষ্টা করে। এমনকি শ্রমিকদের মৃত্যুর খবর গোপন করা বা লাশ সরিয়ে ফেলার চেষ্টা করে।
গ্যাসের বিষক্রিয়ায় আরও বেশ কয়েকজন শ্রমিক আক্রান্ত হয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তাদের উদ্ধার করে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
৯ শ্রমিকের মৃত্যুর বিষয়টি সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফখরুল ইসলাম নিশ্চিত করেছেন। ঘটনাস্থলে শ্রমিকদের লাশ ঘিরে স্বজনদের বুকফাটা আর্তনাদে পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে।
নিহতরা হলেন-দুই সহোদর মনসুর আলী ও নাছির উদ্দিন। তারা সীতাকুণ্ড উপজেলার ভাটিয়ারি ইউনিয়নের আকবর আলীর হাটের মোহাম্মদ সেকান্দরের ছেলে। অপর ৭ জন হলেন-পাবনার সুজানগর উপজেলার সৈয়দপুর এলাকার মোহাম্মদ আলীর ছেলের আবদুল আলীম সুজন (৩৬), গাইবান্ধা সদর উপজেলার উত্তর কুপতলা এলাকার মো. হারুন মিয়ার ছেলে রানা মিয়া (২৩), একই জেলার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার মো. রানা মিয়ার ছেলে খোকন মিয়া, সীতাকুণ্ড উপজেলার খাদেমপাড়া এলাকার আবদুল মালেকের ছেলে হাবিবুর রহমান (৫১), একই উপজেলার ৫নং ওয়ার্ডের প্রদীপ দাশের ছেলে পলাশ দাশ (৩৫), একই বাড়ির সানি দাশ (২৩) ও মো. শরীফ। এর মধ্যে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত মো. শরীফকে চমেক হাসপাতালে নেওয়া হয়নি। তার লাশ নগরীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে রয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
এদিকে নিহতদের দেখতে শুক্রবার বিকালে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ছুটে যান অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এ ঘটনায় সরকারিভাবে তদন্ত কমিটি করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি। নিহতদের প্রত্যেকের পরিবারকে জাহাজ মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসবিএ) পক্ষ থেকে ১০ লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
মন্ত্রী বলেন, এই ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক। তিনি জানান, জাহাজে গ্যাসের লিকেজ সারাতে সেনাবাহিনীর টিম ঘটনাস্থলে গিয়ে কাজ করছে।
পুলিশ, প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্র জানায়-জিরি সুবেদার গ্রুপের মালিকানাধীন ফেরদৌস শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ডে ২০-২৫ বছরের পুরোনো এলএনজিবাহী স্ক্র্যাপ জাহাজ কাটার কাজ করছিলেন ২০-২৫ জন শ্রমিক। এটি এর আগে অর্ধেক কাটা হয়। বাকি অর্ধেক কাটার কাজ করছিলেন তারা। এর মধ্যে কয়েকজন শ্রমিক জাহাজের পাইপ কাটার সময় লিকেজ হয়ে বের হওয়া কার্বন মনোক্সাইড গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে চিৎকার শুরু করেন। তাদের উদ্ধার করতে যান জাহাজে থাকা অন্য শ্রমিকরা। এ অবস্থায় কম-বেশি সবাই বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে পড়েন। এ সময় বাইরের লোকজনের প্রবেশ রোধে কর্তৃপক্ষ ইয়ার্ডের প্রধান গেট বন্ধ করে রাখে। এর মধ্যে অক্সিজেন ঘাটতি তৈরি হয়ে শ্রমিকরা শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত হন এবং অনেকে অচেতন হয়ে পড়েন। পরে একে একে ৯ জনের মৃত্যু হয়।
সকাল সাড়ে ৮টায় ঘটনা ঘটলেও ফায়ার সার্ভিসকে খবর দেওয়া হয় সকাল সাড়ে ১০টার দিকে। খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কুমিরা ফায়ার স্টেশনের দুটি ইউনিট, রেসকিউ ভ্যান ও অ্যাম্বুলেন্স পাঠানো হয়।
ফায়ার সার্ভিস চট্টগ্রাম বিভাগের উপপরিচালক তৌফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, শ্রমিকরা যে জাহাজটিতে কাজ করছিলেন সেটি এলএনজিবাহী পুরাতন জাহাজ। ২০-২৫ বছরের পুরোনো জাহাজ স্ক্র্যাপ হিসাবে বিক্রি করা হয়। জাহাজে এলএনজির অনেক উপজাত বিশেষ করে কার্বন মনোক্সাইড গ্যাস থাকে। যা খুবই বিষাক্ত। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে এ ধরনের জাহাজ কাটার আগে তা পরিষ্কার বা রাসায়নিক-মুক্ত করতে হয়। আমাদের দেশে অনেক শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড মালিক সাধারণত এটা করেন না। দীর্ঘদিন এটা অব্যবহৃত পড়ে ছিল। এই জাহাজও কেমিক্যাল-ফ্রি করা হয়নি। ফলে পাইপ কাটার জন্য যখন শ্রমিকরা গেছেন এবং কাটা শুরু করেছেন তখন সামনে যারা ছিলেন লিকেজ হয়ে বের হওয়া গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে তারা মারা গেছেন। একটু দূরে যারা ছিলেন তারা আক্রান্ত হয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, তাদের টিম সকাল ১০টা ৫০ মিনিটের দিকে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে তিনজনের লাশ উদ্ধার করে এবং তিনজনকে অসুস্থ অবস্থায় উদ্ধার করে স্থানীয় বিএসবি হাসপাতালে পাঠায়। এর মধ্যে জাহাজের একজন ফোরম্যানও ছিলেন। তবে এর আগে কী ঘটেছিল বা লাশ আরও সরানো হয়েছে কিনা তা তারা জানতে পারেননি। তারা যাওয়ার আগে স্থানীয় লোকজন বেশকিছু শ্রমিককে উদ্ধার করেন।
সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ফখরুল ইসলাম জানান, এ ঘটনায় দায়দায়িত্ব নির্ধারণে তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে।
প্রত্যক্ষদর্শী জেলেরা জানিয়েছেন, জাহাজটি থেকে নির্গত হওয়া গ্যাসের বিষক্রিয়া বাতাসে অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়েছে। খালে ঢুকতে না পেরে তাদের বোটগুলো অন্তত আধা কিলোমিটার দূরে গিয়ে ঘাটে ভেড়াতে হয়েছে।