দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত রাষ্ট্রদূত সার্জিও গর তিন দিনের প্রথম বাংলাদেশ সফর শেষে কৌশলগত ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরো জোরদার এবং রোহিঙ্গা সঙ্কট সমাধানে অব্যাহত সহযোগিতার বিষয়ে ওয়াশিংটনের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
৩০ জুলাই থেকে ১ আগস্ট পর্যন্ত সফর শেষে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস এক বিবৃতিতে জানায়, ‘এই সফর যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যকার সম্পর্কের ব্যাপ্তি ও গভীরতাকে তুলে ধরেছে।’
সফরকালে গর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সাথে বৈঠক করেন। এছাড়া তিনি কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শন করেন, যা বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের ক্রমবর্ধমান পরিধির প্রতিফলন।
শনিবার (১ আগস্ট) সকালে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে সৌজন্য সাক্ষাতে গর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন।
বৈঠক শেষে নয়াদিল্লিতে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত হিসেবেও দায়িত্ব পালনকারী গর বলেন, বাংলাদেশের সাথে অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং সামগ্রিক অংশীদারত্ব আরো শক্তিশালী করা ওয়াশিংটনের অন্যতম অগ্রাধিকার।
মার্কিন দূতাবাসের এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘আজ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণ এবং অংশীদারিত্ব জোরদারের বিশাল সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করার সুযোগ পেয়েছি।’
তিনি আরো বলেন, ‘এটি যুক্তরাষ্ট্রের একটি অগ্রাধিকার এবং আমরা একসাথে বাস্তব সাফল্য অর্জন করতে পারি।’
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিশেষ করে গুদামজাতকরণ, সয়াবিন, তুলা, গম এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতে যুক্তরাষ্ট্রের অব্যাহত বিনিয়োগ কামনা করেন। তিনি বলেন, এ ধরনের বিনিয়োগ বাংলাদেশের সরবরাহ ব্যবস্থা আরো শক্তিশালী ও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলবে।
দুই পক্ষ যুক্তরাষ্ট্রের ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ফাইন্যান্স করপোরেশন (ডিএফসি)-এর মাধ্যমে সহযোগিতা সম্প্রসারণ নিয়েও আলোচনা করেন। গর আশ্বাস দেন, ২০১৯ সালে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমলে প্রতিষ্ঠিত ডিএফসির মাধ্যমে বাংলাদেশে মার্কিন সম্পৃক্ততা বাড়াতে ওয়াশিংটন ইতিবাচকভাবে কাজ করবে।
তিনি জানান, বাংলাদেশে কর্মরত মার্কিন বিনিয়োগকারীরা অদূর ভবিষ্যতে একটি ‘ইউএস ইনভেস্টরস সামিট’ আয়োজন করতে আগ্রহী এবং এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে তিনি ব্যক্তিগতভাবে কাজ করছেন।
আগামী মাসে ইউএস-বাংলাদেশ বিজনেস কাউন্সিল-এর একটি প্রতিনিধি দলের সম্ভাব্য বাংলাদেশ সফরের বিষয়টিও আলোচনায় উঠে আসে।
এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফডিএ)-এর সাথে সহযোগিতা সম্প্রসারণ নিয়েও আলোচনা হয়। গর জানান, সংস্থাটি বাংলাদেশে পুনরায় পরিদর্শন কার্যক্রম শুরু করবে।
তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বের প্রশংসা করে বলেন, বাংলাদেশে স্থিতিশীলতা ফিরে আসছে। এ কারণে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের জন্য ভ্রমণ সতর্কতার মাত্রা লেভেল-৩ থেকে লেভেল-২-তে নামিয়ে এনেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভ্রমণ সতর্কতায় লেভেল-৩-তে ভ্রমণকারীদের বাংলাদেশ সফর পুনর্বিবেচনার পরামর্শ দেয়া হয়, আর লেভেল-২-তে বাড়তি সতর্কতার সাথে ভ্রমণের পরামর্শ দেয়া হয়।
গর বলেন, এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের বাড়তে থাকা আস্থার প্রতিফলন এবং এটি মার্কিন বিনিয়োগকারীদের জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করবে।
কক্সবাজার সফরকালে তিনি এক মিলিয়নেরও বেশি জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিককে আশ্রয় দেয়া এবং তাদের মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখায় বাংলাদেশের প্রশংসা করেন।
তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র এই শিবিরগুলোর সহায়তায় ভূমিকা রেখে আসছে এবং আমরা বিশ্বের অন্যান্য অংশীদারদেরও তাদের অবদান বাড়ানোর আহ্বান জানাই।’
রোহিঙ্গা সঙ্কটের দ্রুত, টেকসই ও রাজনৈতিক সমাধানের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়ে গর বলেন, এ জন্য আসিয়ান, প্রতিবেশী দেশ এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রোহিঙ্গাদের জন্য আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তার অর্ধেকেরও বেশি প্রদান করায় যুক্তরাষ্ট্রকে ধন্যবাদ জানান।
এর আগে, বৃহস্পতিবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সাথে বৈঠকে তিনি অংশ নেন। বৈঠক শেষে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক বর্তমানে ‘খুবই ইতিবাচক ধারায়’ এগোচ্ছে এবং উভয় দেশ বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি, অভিবাসন ও আঞ্চলিক বিষয়ে সহযোগিতা আরো জোরদারে আগ্রহী।
তিনি বলেন, ‘আমাদের আলোচনা অত্যন্ত ফলপ্রসূ হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চমৎকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক রয়েছে। কীভাবে এ সম্পর্ককে আরো এগিয়ে নেওয়া যায়, তা নিয়েই আলোচনা করেছি।’
আলোচনায় বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি সহযোগিতা, অভিবাসন, রোহিঙ্গা সঙ্কট এবং জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বাংলাদেশের আসন্ন সভাপতিত্বের বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়।
বৈঠক-পরবর্তী সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের সাথে চীন বা ভারতের সম্পর্ক নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। তিনি আরো বলেন, মিয়ানমারে মানবিক করিডোর স্থাপনের কোনো প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্র দিয়েছে—এমন খবরও সঠিক নয়।
মার্কিন দূতাবাস জানায়, সার্জিও গরের এই সফর দুই দেশের দীর্ঘস্থায়ী অংশীদারত্বকে আরো সুদৃঢ় করেছে এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও আঞ্চলিক বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সাথে সহযোগিতা জোরদারে যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে। বাসস