Cox News

হামে আক্রান্ত সন্তানদের সেবা করতে গিয়ে মায়ের মৃত্যু


প্রকাশ : ০১ আগস্ট ২০২৬ | প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড

হামে আক্রান্ত সন্তানদের সেবা করতে গিয়ে মায়ের মৃত্যু
হাসপাতালে হামে আক্রান্ত দংওয়াই ম্রো।

বান্দরবান সদর হাসপাতালে হামে আক্রান্ত সন্তানদের সেবা করতে করতে অসুস্থ হয়ে পড়েন লেংরুং ম্রো (২৬) নামের এক নারী। পরে গত বুধবার ওই নারীকে কবিরাজের কাছে নিতে গ্রামের বাড়ি রুমা উপজেলার চিনিপাড়ায় নেওয়ার পর তার মৃত্যু হয়। বর্তমানে তার চার বছরের মেয়ে দংওয়াই ম্রো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। 

শনিবার বিকেল চারটার দিকে বান্দরবান সদর হাসপাতালের হাম আক্রান্তদের জন্য স্থাপিত আইসোলেশন ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, বিছানায় শুয়ে চিকিৎসাসেবা নিচ্ছে দংওয়াই ম্রো। দুই ভাই-বোন গত শুক্রবার দুপুর পর্যন্ত ছয় নম্বর বেডে একত্রে ছিল। কাইনওয়াই ম্রো সুস্থ হওয়ায় তাদের এক আত্মীয় কাইনওয়াই ম্রোকে শুক্রবার দুপুরে নিজ বাড়িতে নিয়ে যান। তবে শিশুরা এখনো জানে না যে তাদের মা মারা গেছেন।

বিছানার পাশে বিমর্ষ মুখে বসে ছিলেন চাচা ক্রংতং ম্রো (১৯)। নিজের চোখের পানি লুকিয়ে তিনি কখনো ভাইঝির দিকে তাকিয়ে ছিলেন। 

ক্রংতং ম্রো জানান, তাদের বাড়ি বান্দরবানের রুমা উপজেলার দুর্গম গ্যালেঙ্গা ইউনিয়নের চিনিপাড়া গ্রামে। গত দুই সপ্তাহ আগে তাদের মা লেংরুং ম্রো তার বড় সন্তান তাইলেং ম্রোকে (৭) হামে আক্রান্ত হওয়ায় জেলা সদর হাসপাতালে নিয়ে আসেন। চারদিন হাসপাতালে থাকার পর সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরেন।

তিনি আরও বলেন, গত ২৬ জুলাই আমার ভাবি লেংরুং ম্রো সুস্থ অবস্থায় হামে আক্রান্ত দুই সন্তানকে নিয়ে বান্দরবান সদর হাসপাতালে ভর্তি করান। সন্তানদের সেবা-যত্ন করছিলেন। কিন্তু ২৮ জুলাই হঠাৎ তিনিও অসুস্থ হয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। 

হাসপাতালের চিকিৎসকরা তার অবস্থা আশঙ্কাজনক দেখে উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানোর পরামর্শ দেন। 

ক্রংতং ম্রো বলেন, ‘আমার বড় ভাই ক্রংসং ম্রো (২৮) অক্ষরজ্ঞানহীন। তিনি বাংলা ভাষাও ভালোমতো বলতে পারেন না। হাতে কোনো টাকা ছিল না তার। তিনি শুনেছিলেন, চট্টগ্রাম মেডিকেলে চিকিৎসা করাতে অনেক টাকা লাগবে। সেই ভয়ে তিনি স্ত্রীকে চট্টগ্রামে না নিয়ে গ্রামের বাড়িতে কবিরাজি চিকিৎসার কথা বলে নিয়ে যান। আর দুই শিশুর দেখাশোনার দায়িত্ব আমার ওপর দিয়ে যান।’ 

২৯ জুলাই বিকেলে গ্রামে পৌঁছানোর পর তার মৃত্যু হয়। পরদিন ৩০ জুলাই পারিবারিকভাবে তার শেষকৃত্য সম্পন্ন করা হয়। 

ক্রংতং ম্রো আরও বলেন, ‘হাসপাতালের নার্সরা জানিয়েছেন, অসুস্থ সন্তানদের সেবা করতে গিয়ে তিনিও (লেংরুং ম্রো) অসুস্থ হয়ে পড়েন।’

এদিকে স্ত্রীর মৃত্যুর পর থেকেই শিশুদের বাবা ক্রংসং ম্রোও জ্বরে আক্রান্ত হয়ে নিজ বাড়িতে শয্যাশায়ী হয়ে পড়ে আছেন। ফলে তিন শিশুর দেখাশোনা, চিকিৎসা আর হাসপাতালে দিন-রাত থাকা—সব দায়িত্ব এখন চাচা ক্রংতং ম্রোর কাঁধে পড়েছে।

হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থাকা দংওয়াই ম্রো অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। যেন সে তার চোখে-মুখে আপন কাউকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। কখনো চাচার কোলে মাথা রাখে, কখনো কান্না করে।

রুমার দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় সম্প্রতি হামের প্রাদুর্ভাব উদ্বেগজনক আকার ধারণ করেছে। দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থা, দারিদ্র্য আর সময়মতো টিকা না পাওয়ায় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়েছে শিশুরা।

জেলা সদর হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, হাসপাতালে আইসোলেশন ওয়ার্ডে শিশু ১৫ জন, নারী ৬ জন ও পুরুষ ৩ জন হামে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন আছেন। চলতি বছর জেলায় হামে আক্রান্ত হয়েছে ১ হাজার ৫০০-এর অধিক। সরকারি হিসাবে হামে মারা গেছে ৯ জন। 

বিষয় : বান্দরবান হাম

Cox News

শনিবার, ০১ আগস্ট ২০২৬


হামে আক্রান্ত সন্তানদের সেবা করতে গিয়ে মায়ের মৃত্যু

প্রকাশের তারিখ : ০১ আগস্ট ২০২৬

featured Image

বান্দরবান সদর হাসপাতালে হামে আক্রান্ত সন্তানদের সেবা করতে করতে অসুস্থ হয়ে পড়েন লেংরুং ম্রো (২৬) নামের এক নারী। পরে গত বুধবার ওই নারীকে কবিরাজের কাছে নিতে গ্রামের বাড়ি রুমা উপজেলার চিনিপাড়ায় নেওয়ার পর তার মৃত্যু হয়। বর্তমানে তার চার বছরের মেয়ে দংওয়াই ম্রো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। 

শনিবার বিকেল চারটার দিকে বান্দরবান সদর হাসপাতালের হাম আক্রান্তদের জন্য স্থাপিত আইসোলেশন ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, বিছানায় শুয়ে চিকিৎসাসেবা নিচ্ছে দংওয়াই ম্রো। দুই ভাই-বোন গত শুক্রবার দুপুর পর্যন্ত ছয় নম্বর বেডে একত্রে ছিল। কাইনওয়াই ম্রো সুস্থ হওয়ায় তাদের এক আত্মীয় কাইনওয়াই ম্রোকে শুক্রবার দুপুরে নিজ বাড়িতে নিয়ে যান। তবে শিশুরা এখনো জানে না যে তাদের মা মারা গেছেন।

বিছানার পাশে বিমর্ষ মুখে বসে ছিলেন চাচা ক্রংতং ম্রো (১৯)। নিজের চোখের পানি লুকিয়ে তিনি কখনো ভাইঝির দিকে তাকিয়ে ছিলেন। 

ক্রংতং ম্রো জানান, তাদের বাড়ি বান্দরবানের রুমা উপজেলার দুর্গম গ্যালেঙ্গা ইউনিয়নের চিনিপাড়া গ্রামে। গত দুই সপ্তাহ আগে তাদের মা লেংরুং ম্রো তার বড় সন্তান তাইলেং ম্রোকে (৭) হামে আক্রান্ত হওয়ায় জেলা সদর হাসপাতালে নিয়ে আসেন। চারদিন হাসপাতালে থাকার পর সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরেন।

তিনি আরও বলেন, গত ২৬ জুলাই আমার ভাবি লেংরুং ম্রো সুস্থ অবস্থায় হামে আক্রান্ত দুই সন্তানকে নিয়ে বান্দরবান সদর হাসপাতালে ভর্তি করান। সন্তানদের সেবা-যত্ন করছিলেন। কিন্তু ২৮ জুলাই হঠাৎ তিনিও অসুস্থ হয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। 

হাসপাতালের চিকিৎসকরা তার অবস্থা আশঙ্কাজনক দেখে উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানোর পরামর্শ দেন। 

ক্রংতং ম্রো বলেন, ‘আমার বড় ভাই ক্রংসং ম্রো (২৮) অক্ষরজ্ঞানহীন। তিনি বাংলা ভাষাও ভালোমতো বলতে পারেন না। হাতে কোনো টাকা ছিল না তার। তিনি শুনেছিলেন, চট্টগ্রাম মেডিকেলে চিকিৎসা করাতে অনেক টাকা লাগবে। সেই ভয়ে তিনি স্ত্রীকে চট্টগ্রামে না নিয়ে গ্রামের বাড়িতে কবিরাজি চিকিৎসার কথা বলে নিয়ে যান। আর দুই শিশুর দেখাশোনার দায়িত্ব আমার ওপর দিয়ে যান।’ 

২৯ জুলাই বিকেলে গ্রামে পৌঁছানোর পর তার মৃত্যু হয়। পরদিন ৩০ জুলাই পারিবারিকভাবে তার শেষকৃত্য সম্পন্ন করা হয়। 

ক্রংতং ম্রো আরও বলেন, ‘হাসপাতালের নার্সরা জানিয়েছেন, অসুস্থ সন্তানদের সেবা করতে গিয়ে তিনিও (লেংরুং ম্রো) অসুস্থ হয়ে পড়েন।’

এদিকে স্ত্রীর মৃত্যুর পর থেকেই শিশুদের বাবা ক্রংসং ম্রোও জ্বরে আক্রান্ত হয়ে নিজ বাড়িতে শয্যাশায়ী হয়ে পড়ে আছেন। ফলে তিন শিশুর দেখাশোনা, চিকিৎসা আর হাসপাতালে দিন-রাত থাকা—সব দায়িত্ব এখন চাচা ক্রংতং ম্রোর কাঁধে পড়েছে।

হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থাকা দংওয়াই ম্রো অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। যেন সে তার চোখে-মুখে আপন কাউকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। কখনো চাচার কোলে মাথা রাখে, কখনো কান্না করে।

রুমার দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় সম্প্রতি হামের প্রাদুর্ভাব উদ্বেগজনক আকার ধারণ করেছে। দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থা, দারিদ্র্য আর সময়মতো টিকা না পাওয়ায় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়েছে শিশুরা।

জেলা সদর হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, হাসপাতালে আইসোলেশন ওয়ার্ডে শিশু ১৫ জন, নারী ৬ জন ও পুরুষ ৩ জন হামে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন আছেন। চলতি বছর জেলায় হামে আক্রান্ত হয়েছে ১ হাজার ৫০০-এর অধিক। সরকারি হিসাবে হামে মারা গেছে ৯ জন। 


Cox News


কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
হামে আক্রান্ত সন্তানদের সেবা করতে গিয়ে মায়ের মৃত্যু
0:00 0:00
1.0x