রাজধানীর কলাবাগানে স্ত্রী ও শাশুড়িকে নৃশংসভাবে ছুরিকাঘাতে হত্যার ঘটনায় অভিযুক্ত জামাতা শিপনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তবে হত্যাকাণ্ডটি তাৎক্ষণিক উত্তেজনার বশে, নাকি পূর্বপরিকল্পিতভাবে ঘটানো হয়েছে—সেটি তদন্ত করে দেখছেন তারা। সুরতহাল প্রতিবেদনে দুজনের শরীরেই ১০ থেকে ১২টি ছুরিকাঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট ও পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, স্বামী-স্ত্রী হত্যার ঘটনায় পরকীয়া বা সন্দেহের বিষয় সামনে এলেও এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত তেমন কোনো তথ্য মেলেনি। তবে বিয়ের পর থেকেই শিপন ও ফারজানার দাম্পত্য সম্পর্কে টানাপোড়েন ছিল। অনেকটা ইগো প্রবলেম। বিভিন্ন পারিবারিক বিষয় নিয়ে তাদের মধ্যে প্রায়ই ঝগড়া হতো। কেউ কাউকে ছাড় দিতেন না। স্ত্রী মনে করতেন তাঁর অবস্থান সঠিক, অন্যদিকে শিপনের অভিযোগ ছিল, স্ত্রী তাঁকে যথাযথ সম্মান করেন না। এসব বিষয় নিয়েই তাদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল বলে তদন্তকারীদের ধারণা।
নিহতেরা হলেন—ফারজানা আক্তার রাত্রী ও তাঁর মা ফিরোজা বেগম।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, ফারজানা ছিলেন বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। পরিবারের অমতে প্রেম করে গাড়িচালক শিপনকে বিয়ে করেছিলেন তিনি। সেই বিয়ে মেনে নিতে পারেননি তাঁর পরিবার। তাই শ্বশুরবাড়ির সঙ্গে শিপনের সম্পর্কও স্বাভাবিক হয়নি।
শিপন ও ফারজানার সংসারে এক বছর বয়সী একটি ছেলে সন্তান রয়েছে। মায়ের পাশাপাশি নানিকেও হারিয়েছে শিশুটি। শরীয়তপুরে মা ও মেয়ের দাফন শেষে নাতিকে নিয়ে ঢাকায় ফিরেছেন নিহত ফারজানার বাবা, ফল বিক্রেতা ফারুক হোসেন।
ফারুক বলেন, ‘আমার একমাত্র মেয়ে আর স্ত্রীকে হারিয়েছি। এই হত্যাকাণ্ডের বিচার চাই। বিয়ের পর থেকেই শিপন আমার মেয়ের সঙ্গে ঝগড়া করত। সংসারে অশান্তির কারণে মেয়ে তালাকের কথাও বলেছিল। কিন্তু তাই বলে এভাবে দুজনকে হত্যা করবে, সেটা ভাবিনি।’
কলাবাগান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ফজলে আশিক বলেন, পরিবারের করা হত্যা মামলায় শিপনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, ঘটনার আগে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে শাশুড়ি মেয়ের পক্ষ নিয়ে কথা বললে শিপন দুজনকেই ছুরিকাঘাত করেন।
ওসি আরও বলেন, ‘শোনা যাচ্ছে, শিপন ছুরি সঙ্গে নিয়েই শ্বশুরবাড়িতে গিয়েছিলেন। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। যদি তা প্রমাণিত হয়, তাহলে হত্যাকাণ্ডটি পূর্বপরিকল্পিত ছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হবে।’
কলাবাগান থানার উপপরিদর্শক (এসআই) লিজা আক্তারের প্রস্তুত করা সুরতহাল প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, নিহত দুজনের মুখমণ্ডল, গলা ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে আনুমানিক ১০ থেকে ১২টি ছুরিকাঘাতের চিহ্ন রয়েছে।
পুলিশ জানায়, পিকআপচালক শিপন স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে মোহাম্মদপুরে ভাড়া বাসায় থাকতেন। আর ফারজানার বাবার বাসা ছিল কাঁঠালবাগানের আল-আমিন মসজিদ রোডের ৫২/২ নম্বর বাড়ির পঞ্চম তলায়। স্বামীর স্বল্প আয়সহ বিভিন্ন পারিবারিক বিষয় নিয়ে তাদের মধ্যে প্রায়ই বিরোধ হতো। এ কারণে ফারজানা প্রায়ই বাবার বাড়িতে গিয়ে থাকতেন। ঘটনার আগের রাতেও তিনি সেখানেই ছিলেন।
তদন্ত কর্মকর্তারা জানান, গ্রেপ্তারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে শিপন জানিয়েছেন, ঘটনার দিন সকালে তিনি শ্বশুরবাড়িতে যান। সেখানে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে শাশুড়ি মেয়ের পক্ষ নিয়ে তাঁকে বকাঝকা করেন এবং বলেন– তাঁর মেয়ে আর শিপনের সঙ্গে থাকবে না, তালাক দেবে। এতে শিপন উত্তেজিত হয়ে প্রথমে স্ত্রীকে এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাত করেন। মেয়েকে রক্ষা করতে এগিয়ে এলে শাশুড়িকেও ছুরিকাঘাত করেন। ঘটনাস্থলেই মা ও মেয়ের মৃত্যু হয়।
হত্যাকাণ্ডের পর শিপন তাঁর এক বছর বয়সী ছেলে রায়হানকে নিয়ে ঘটনাস্থল থেকে বেরিয়ে যান। পরে তিনি নিজেই পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেন।
পুলিশ বলছে, হত্যার পেছনে দাম্পত্য কলহই প্রধান কারণ বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হলেও ঘটনাটি পরিকল্পিত ছিল কি না, তা নিশ্চিত হতে বিভিন্ন আলামত ও সাক্ষ্য-প্রমাণ বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।