Cox News

ইজারা বাতিল হলেই ‘চকরিয়া সুন্দরবন’ ফিরবে


প্রকাশ : ২৬ জুলাই ২০২৬ | প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড

ইজারা বাতিল হলেই ‘চকরিয়া সুন্দরবন’ ফিরবে
হারিয়ে যাওয়া চকরিয়া সুন্দরবনে বেঁচে থাকা একমাত্র সুন্দরী গাছ। গতকাল শনিবার ফাঁসিয়াখালী থেকে তোলা সমকাল

কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৭ কিলোমিটার দূরে ফাঁসিয়াখালীর নতুন মসজিদ এলাকায় দাঁড়িয়ে একটি সুন্দরী গাছ। কক্সবাজার-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পশ্চিম পাশে এ গাছটির কয়েক ফুট পশ্চিমে দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথ। আশপাশে তেমন জনবসতি নেই। গাছটির ডালে নেই পাখির কোলাহল। শুধু সুন্দরী গাছটি একাই দাঁড়িয়ে; যা হারিয়ে যাওয়া চকরিয়া সুন্দরবনের সাক্ষ্য বহন করে।  চকরিয়া উপজেলায় এখন যে ২১ হাজার একর এলাকাজুড়ে চিংড়ির ঘের, সেটিই এক সময়ের কক্সবাজার জেলার চকরিয়া সুন্দরবন। সত্তরের দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত এলাকাটি নানা দেশীয় প্রজাতি গাছে সমৃদ্ধ একটি প্যারাবন ছিল। বনের প্রধান প্রজাতিগুলোর অন্যতম ছিল সুন্দরী গাছ। এছাড়া ছিল গেওয়া, কেওড়া, হেঁতাল, পশুর, ধুন্দল, হাওয়া, গোলপাতা। এ বনে ছিল বাঘ, হরিণ, বুনোশূকর, বানরসহ নানা বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল। চকরিয়া সুন্দরবনে মাছ ও প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো চিংড়িও প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যেত।

পরিবেশবাদীরা বলছেন, সরকারের ভুল নীতি আর দখল-বেদখলে মাত্র তিন দশকেই দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল থেকে হারিয়ে গেছে চকরিয়া সুন্দরবন। ইতোমধ্যে ‘চকরিয়া সুন্দরবন’কে সংরক্ষিত বন থেকে অবমুক্ত (ডি-রিজার্ভ) করা সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন এবং সুন্দরবনের সংরক্ষিত ও রক্ষিত বনভূমি পুনরুদ্ধারে ব্যর্থতা কেন, তা জানতে চেয়ে রুল দিয়েছেন হাইকোর্ট। পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) এক রিট মামলার পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৯ জুলাই এ রুল দেওয়া হয়।

চকরিয়া সুন্দরবনে জমি ইজারা দেওয়া হয়েছিল চিংড়ি চাষের নামে। এখন সেখানে বন ফিরিয়ে আনতে হলে সেটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া। এ জন্য প্রথমে যে ইজারা দেওয়া হয়েছিল, তা বাতিল করতে হবে বলে মত দিয়েছেন কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. মারুফ হোসেন। তিনি বলেন, বিষয়টি নীতিগত সিদ্ধান্তের ব্যাপার। ‘চকরিয়া সুন্দরবন’ বনভূমি থেকে সব ধরনের অবৈধ ইজারা বরাদ্দ বাতিল এবং অননুমোদিত দখলদার উচ্ছেদ করে বনভূমি সুরক্ষা, সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধারের নির্দেশ কেন দেওয়া হবে না, সে বিষয়েও হাইকোর্টের রুলে জানতে চাওয়া হয়েছে। এর আগে গত জুন মাসে চকরিয়া সুন্দরবন বিষয়ে চকরিয়ার ইউএনওর কাছে একটি প্রতিবেদন দিয়েছেন এসিল্যান্ড। এই প্রতিবেদনে চকরিয়া সুন্দরবন এলাকার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়ে পাঁচটি সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে। এরমধ্যে রয়েছে, চিংড়ি চাষের জন্য দেওয়া ইজারাদারদের কাছ থেকে জমির বকেয়া খাজনা ক্ষতিপূরণসহ আদায় করা, চিংড়ি ঘেরের জমি ভোগ দখলে থাকা লোকজনকে ইজারার আওতায় আনা, ওই এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে উপযুক্ত স্থানে পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপন, চিংড়িমহাল ব্যবস্থাপনা নীতিমালা সংশোধনপূর্বক যুগোপযোগী নীতিমালা প্রণয়ন, প্রধানমন্ত্রীর আগ্রহ এবং নির্দেশনা অনুযায়ী পরিবেশ, প্রতিবেশ সংরক্ষণ করে বর্তমান ব্যবহারভিত্তিক কাজে লাগিয়ে রাজস্ব বৃদ্ধিসহ জনগণের জীবনমান উন্নয়নের জন্য ভূমি মন্ত্রণালয়, বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় কর্তৃক সরকারের সুনির্দিষ্ট অবস্থান নির্ধারণ করে তা হাইকোর্টে উপস্থাপন করে রিট মামলাটি নিষ্পত্তির উদ্যোগ গ্রহণ করা।

চকরিয়ার উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) রূপায়ণ দেব বলেন, চকরিয়া সুন্দরবন ফিরিয়ে আনা সম্ভব; তবে এটা এক দিনের বিষয় নয়, দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন। তাছাড়া সরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের একার পক্ষে সম্ভব নয়, সংশ্লিষ্ট একাধিক সংস্থার সমন্বিতভাবে উদ্যোগ নিতে হবে।  এ অঞ্চলে মানুষের বসতি গড়ে ওঠার পর থেকেই চকরিয়া সুন্দরবনের গাছ কাটা শুরু হয়। তবে ১৯৭০-এর দশকের শেষভাগে এসে এই বন যে ধ্বংসযজ্ঞের মুখে পড়ে, তার নজির আগে ছিল না। ওই সময় আন্তর্জাতিক বাজারে চিংড়ির চাহিদা বেড়ে যায়। ফলে, বাংলাদেশে বাণিজ্যিক চিংড়ি চাষের সম্প্রসারণ ঘটে এবং এই বনভূমিকে সম্পূর্ণভাবে চিংড়ির ঘেরে পরিণত করা হয়। ইয়ুথ এনভায়রনমেন্ট সোসাইটির (ইয়েস) চেয়ারম্যান আইনজীবী মুজিবুল হক বলেন, চকরিয়া সুন্দরবন ধ্বংসের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের প্রকৃতি থেকে কেবল একটি বনই উধাও হয়নি; এতে স্থানীয় মানুষের জ্বালানির উৎস বিপন্ন হয়েছে, প্রাকৃতিক মৎস্য সম্পদ নিঃশেষ হয়েছে, বননির্ভর মানুষ পেশা হারিয়েছে, জলাভূমি নষ্ট হয়েছে, মাটির লবণাক্ততা বেড়েছে, জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ঘূর্ণিঝড় বা জলোচ্ছ্বাস রোধের প্রাকৃতিক বর্ম ধ্বংস হয়েছে।

বিষয় : ইজারা

Cox News

রোববার, ২৬ জুলাই ২০২৬


ইজারা বাতিল হলেই ‘চকরিয়া সুন্দরবন’ ফিরবে

প্রকাশের তারিখ : ২৬ জুলাই ২০২৬

featured Image

কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৭ কিলোমিটার দূরে ফাঁসিয়াখালীর নতুন মসজিদ এলাকায় দাঁড়িয়ে একটি সুন্দরী গাছ। কক্সবাজার-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পশ্চিম পাশে এ গাছটির কয়েক ফুট পশ্চিমে দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথ। আশপাশে তেমন জনবসতি নেই। গাছটির ডালে নেই পাখির কোলাহল। শুধু সুন্দরী গাছটি একাই দাঁড়িয়ে; যা হারিয়ে যাওয়া চকরিয়া সুন্দরবনের সাক্ষ্য বহন করে।  চকরিয়া উপজেলায় এখন যে ২১ হাজার একর এলাকাজুড়ে চিংড়ির ঘের, সেটিই এক সময়ের কক্সবাজার জেলার চকরিয়া সুন্দরবন। সত্তরের দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত এলাকাটি নানা দেশীয় প্রজাতি গাছে সমৃদ্ধ একটি প্যারাবন ছিল। বনের প্রধান প্রজাতিগুলোর অন্যতম ছিল সুন্দরী গাছ। এছাড়া ছিল গেওয়া, কেওড়া, হেঁতাল, পশুর, ধুন্দল, হাওয়া, গোলপাতা। এ বনে ছিল বাঘ, হরিণ, বুনোশূকর, বানরসহ নানা বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল। চকরিয়া সুন্দরবনে মাছ ও প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো চিংড়িও প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যেত।

পরিবেশবাদীরা বলছেন, সরকারের ভুল নীতি আর দখল-বেদখলে মাত্র তিন দশকেই দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল থেকে হারিয়ে গেছে চকরিয়া সুন্দরবন। ইতোমধ্যে ‘চকরিয়া সুন্দরবন’কে সংরক্ষিত বন থেকে অবমুক্ত (ডি-রিজার্ভ) করা সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন এবং সুন্দরবনের সংরক্ষিত ও রক্ষিত বনভূমি পুনরুদ্ধারে ব্যর্থতা কেন, তা জানতে চেয়ে রুল দিয়েছেন হাইকোর্ট। পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) এক রিট মামলার পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৯ জুলাই এ রুল দেওয়া হয়।

চকরিয়া সুন্দরবনে জমি ইজারা দেওয়া হয়েছিল চিংড়ি চাষের নামে। এখন সেখানে বন ফিরিয়ে আনতে হলে সেটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া। এ জন্য প্রথমে যে ইজারা দেওয়া হয়েছিল, তা বাতিল করতে হবে বলে মত দিয়েছেন কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. মারুফ হোসেন। তিনি বলেন, বিষয়টি নীতিগত সিদ্ধান্তের ব্যাপার। ‘চকরিয়া সুন্দরবন’ বনভূমি থেকে সব ধরনের অবৈধ ইজারা বরাদ্দ বাতিল এবং অননুমোদিত দখলদার উচ্ছেদ করে বনভূমি সুরক্ষা, সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধারের নির্দেশ কেন দেওয়া হবে না, সে বিষয়েও হাইকোর্টের রুলে জানতে চাওয়া হয়েছে। এর আগে গত জুন মাসে চকরিয়া সুন্দরবন বিষয়ে চকরিয়ার ইউএনওর কাছে একটি প্রতিবেদন দিয়েছেন এসিল্যান্ড। এই প্রতিবেদনে চকরিয়া সুন্দরবন এলাকার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়ে পাঁচটি সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে। এরমধ্যে রয়েছে, চিংড়ি চাষের জন্য দেওয়া ইজারাদারদের কাছ থেকে জমির বকেয়া খাজনা ক্ষতিপূরণসহ আদায় করা, চিংড়ি ঘেরের জমি ভোগ দখলে থাকা লোকজনকে ইজারার আওতায় আনা, ওই এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে উপযুক্ত স্থানে পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপন, চিংড়িমহাল ব্যবস্থাপনা নীতিমালা সংশোধনপূর্বক যুগোপযোগী নীতিমালা প্রণয়ন, প্রধানমন্ত্রীর আগ্রহ এবং নির্দেশনা অনুযায়ী পরিবেশ, প্রতিবেশ সংরক্ষণ করে বর্তমান ব্যবহারভিত্তিক কাজে লাগিয়ে রাজস্ব বৃদ্ধিসহ জনগণের জীবনমান উন্নয়নের জন্য ভূমি মন্ত্রণালয়, বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় কর্তৃক সরকারের সুনির্দিষ্ট অবস্থান নির্ধারণ করে তা হাইকোর্টে উপস্থাপন করে রিট মামলাটি নিষ্পত্তির উদ্যোগ গ্রহণ করা।

চকরিয়ার উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) রূপায়ণ দেব বলেন, চকরিয়া সুন্দরবন ফিরিয়ে আনা সম্ভব; তবে এটা এক দিনের বিষয় নয়, দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন। তাছাড়া সরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের একার পক্ষে সম্ভব নয়, সংশ্লিষ্ট একাধিক সংস্থার সমন্বিতভাবে উদ্যোগ নিতে হবে।  এ অঞ্চলে মানুষের বসতি গড়ে ওঠার পর থেকেই চকরিয়া সুন্দরবনের গাছ কাটা শুরু হয়। তবে ১৯৭০-এর দশকের শেষভাগে এসে এই বন যে ধ্বংসযজ্ঞের মুখে পড়ে, তার নজির আগে ছিল না। ওই সময় আন্তর্জাতিক বাজারে চিংড়ির চাহিদা বেড়ে যায়। ফলে, বাংলাদেশে বাণিজ্যিক চিংড়ি চাষের সম্প্রসারণ ঘটে এবং এই বনভূমিকে সম্পূর্ণভাবে চিংড়ির ঘেরে পরিণত করা হয়। ইয়ুথ এনভায়রনমেন্ট সোসাইটির (ইয়েস) চেয়ারম্যান আইনজীবী মুজিবুল হক বলেন, চকরিয়া সুন্দরবন ধ্বংসের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের প্রকৃতি থেকে কেবল একটি বনই উধাও হয়নি; এতে স্থানীয় মানুষের জ্বালানির উৎস বিপন্ন হয়েছে, প্রাকৃতিক মৎস্য সম্পদ নিঃশেষ হয়েছে, বননির্ভর মানুষ পেশা হারিয়েছে, জলাভূমি নষ্ট হয়েছে, মাটির লবণাক্ততা বেড়েছে, জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ঘূর্ণিঝড় বা জলোচ্ছ্বাস রোধের প্রাকৃতিক বর্ম ধ্বংস হয়েছে।


Cox News


কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
ইজারা বাতিল হলেই ‘চকরিয়া সুন্দরবন’ ফিরবে
0:00 0:00
1.0x