রোহিঙ্গা সংকটকে শুধু মানবিক সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি বাংলাদেশের মানবিক ও জাতীয় নিরাপত্তা, কূটনৈতিক স্বার্থ এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য ক্রমবর্ধমান হুমকি হয়ে উঠেছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এ কে এম শামছুল ইসলাম।
রোববার (২৩ আগস্ট) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধীন সেন্টার ফর জেনোসাইড স্টাডিজ আয়োজিত ‘Challenges of Rohingya Repatriation: International Politics and National Priorities’ শীর্ষক সেমিনারে সমাপনী বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা বলেন, ‘পরিকল্পনাহীনভাবে নেওয়া এই দায় গত ৯ বছরে বাংলাদেশের জন্য ক্রমেই বড় বোঝায় পরিণত হয়েছে। বর্তমানে কক্সবাজার ও ভাসানচরের ৩৩টি ক্যাম্পে মোট ১১ লাখ ৮০ হাজার রোহিঙ্গা অবস্থান করছে, যেখানে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির ক্রমাগত অবনতি ঘটছে। এসব ক্যাম্পে প্রায় ৬ থেকে ১১টি সশস্ত্র গোষ্ঠী সক্রিয় রয়েছে। ইয়াবাসহ মাদকের চোরাচালান অব্যাহত থাকায় ২০১৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত দু’হাজারেরও বেশি মামলা নিবন্ধিত হয়েছে। এর পাশাপাশি রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জনসংখ্যা বৃদ্ধির উচ্চ হারকেও তিনি উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেন তিনি।
মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির প্রসঙ্গ টেনে ড. শামছুল ইসলাম বলেন, রাখাইন রাজ্যের প্রায় ৯০ শতাংশ এখন স্বাধীন সশস্ত্র গোষ্ঠী ‘আরাকান আর্মি’র নিয়ন্ত্রণে। রোহিঙ্গাদের প্রতি এই গোষ্ঠীর মনোভাব মিয়ানমার সেনাবাহিনীর চেয়েও কঠোর।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের অতীত অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ১৯৭৮ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময় এবং ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে বেগম খালেদা জিয়ার আমলেও কূটনৈতিক দূরদর্শিতার মাধ্যমে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সফল করা হয়েছিল। বর্তমান সরকারও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বর্তমান সরকার ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির ভিত্তিতে রোহিঙ্গা ইস্যুতে এগোচ্ছে বলেও জানান প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা।
তিনি বলেন, ‘মানবিক দায়বদ্ধতা, জাতীয় স্বার্থ ও নিরবচ্ছিন্ন কূটনৈতিক সম্পৃক্ততার সমন্বয়ে সরকার এ সংকট মোকাবেলা করছে।’
পরিস্থিতি সামলাতে তিনি সরকারের ছ’দফা কৌশলের কথা উল্লেখ করেন। এর মধ্যে রয়েছে— জাতিসংঘ, আসিয়ান, ওআইসি, চীন, ভারতসহ গুরুত্বপূর্ণ অংশীজনের মাধ্যমে রোহিঙ্গা সংকটকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরা; চীন ও ভারতের মধ্যে কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখা; মিয়ানমার সরকার ও আরাকান আর্মির সঙ্গে পৃথকভাবে যোগাযোগ রাখা; ক্যাম্পগুলোর নিরাপত্তা জোরদার করা; পূর্ব সীমান্তে বিশ্বাসযোগ্য প্রতিরোধ সক্ষমতা গড়ে তোলা এবং আসিয়ান-ওআইসিকে যুক্ত করে একটি আঞ্চলিক কাঠামো তৈরিতে নেতৃত্ব দেওয়া।
সেমিনারে প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ১৫ আগস্ট মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দেওয়া ঘোষণার কথাও উল্লেখ করেন। ওই ঘোষণায় ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জন রোহিঙ্গাকে প্রত্যাবাসনের জন্য যাচাই করা হয়েছে বলে জানানো হয়। তবে এটিকে প্রকৃত প্রত্যাবাসনের আন্তরিক উদ্যোগ হিসেবে না দেখে আন্তর্জাতিক চাপ কমানো এবং আন্তর্জাতিক আদালতে চলমান গণহত্যার মামলা মোকাবেলার কৌশল হিসেবে দেখার কথা বলেন তিনি।