নয়াপাড়ায় টমটম থেকে মদ উদ্ধারের দাবি; আটকের ১ মিনিট ২৫ সেকেন্ডের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে
লামা (বান্দরবান) প্রতিনিধি:
বান্দরবানের লামা উপজেলার ফাইতং ইউনিয়নের নয়াপাড়া তিন রাস্তার মোড় এলাকায় ২ লিটার চোলাই মদসহ মিউচিং মার্মা (২৬) নামে এক নারীকে স্থানীয়রা আটক করে ফাইতং পুলিশ ফাঁড়িতে সোপর্দ করেছেন। তিনি ফাইতং হেডম্যান পাড়া এলাকার বাসিন্দা উছাই মংয়ের স্ত্রী। বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) দুপুর আনুমানিক ১২টার দিকে এ ঘটনা ঘটে।
স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মিউচিং মার্মা ব্যাটারিচালিত টমটমে করে চকরিয়ার উদ্দেশে যাচ্ছিলেন। নয়াপাড়া তিন রাস্তার মোড়ে স্থানীয়রা টমটমটি থামিয়ে তল্লাশি করলে তার কাছ থেকে আনুমানিক ২ লিটার চোলাই মদ উদ্ধার করা হয় বলে তারা দাবি করেন। পরে তাকে মদসহ ফাইতং পুলিশ ফাঁড়িতে সোপর্দ করা হয়। খবর পেয়ে এএসআই সঞ্চয়ের নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থলে গিয়ে তাকে ফাঁড়িতে নিয়ে যায়।
এদিকে, ঘটনার দিন দুপুর ১টার দিকে সাজ্জাদুল ইসলাম সোহেল নামের এক ব্যক্তির ফেসবুক আইডি থেকে মুঠোফোনে ধারণ করা ১ মিনিট ২৫ সেকেন্ডের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওটিতে স্থানীয় কয়েকজনকে এক নারীকে ঘিরে থাকতে এবং ঘটনাটি নিয়ে কথা বলতে দেখা যায়। ভিডিওটি ওই ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে স্থানীয়দের দাবি। তবে ভিডিওটির ধারণের স্থান, সময় ও সম্পূর্ণ প্রেক্ষাপট স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
স্থানীয় একাধিক বাসিন্দার অভিযোগ, মিউচিং মার্মার স্বামী উছাই মংয়ের খামারবাড়িতে দীর্ঘদিন ধরে চোলাই মদ তৈরি ও সরবরাহের কার্যক্রম চলে আসছে। তাদের অভিযোগ, সেখানে তৈরি করা মদ হরিণখাইয়া এলাকার টিএইচবি ইটভাটার মুখে থাকা একটি ঘর এবং আশপাশের এলাকায় সরবরাহ করা হয়। স্থানীয়দের ভাষ্য, ওইসব স্থানে বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা লোকজন নিয়মিত মদ পান করেন। এ বিষয়ে স্থানীয়রা অতীতেও ফাইতং পুলিশ ফাঁড়িকে অবহিত করেছেন বলে দাবি করেন।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, ফাইতংয়ে মাদকবিরোধী নজরদারি ও পুলিশের টহল বাড়ার পর মদ পরিবহনে কৌশল পরিবর্তন করা হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় মিউচিং মার্মা সাধারণ যাত্রীর মতো টমটমে করে চকরিয়া যাওয়ার সময় মদ বহন করছিলেন বলে স্থানীয়রা দাবি করেন।
ঘটনাস্থলে মদ উদ্ধারের পর মিউচিং মার্মার স্বামী উছাই মং সেখানে উপস্থিত হয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে উত্তপ্ত বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন বলেও অভিযোগ করেছেন কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা। তাদের দাবি, এ সময় তিনি স্থানীয়দের গালমন্দ ও হুমকি দেন। পরে স্থানীয়রা পুলিশকে খবর দিলে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয়। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে উছাই মংয়ের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, উছাই মং দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে ‘ফাইতং ইউনিয়ন সাইবার দলের সভাপতি’ হিসেবে পরিচয় দিয়ে আসছেন। তবে তার এই রাজনৈতিক পরিচয় সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়েছে কি না, তা প্রতিবেদনের সময় যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
পুলিশের উপস্থিতিতে মিউচিং মার্মাকে ফাইতং পুলিশ ফাঁড়িতে নেওয়ার পর পরবর্তীতে মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। তবে কী কারণে এবং কোন আইনগত প্রক্রিয়ায় তাকে মুচলেকায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে পুলিশের বিস্তারিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি। উদ্ধার করা ২ লিটার কথিত চোলাই মদের বিষয়ে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, সেটিও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
ফাইতং পুলিশ ফাঁড়ির এএসআই সঞ্চয় ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, মদসহ ওই নারীকে পুলিশ ফাঁড়িতে নেওয়া হয়েছিল। তবে মুচলেকায় ছেড়ে দেওয়ার বিষয়ে বিস্তারিত বক্তব্য প্রতিবেদনের সময় পাওয়া যায়নি।
এদিকে, মদসহ আটক হওয়ার পর মুচলেকায় ছেড়ে দেওয়ার ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, “আমাদের ধারণা, রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণেই হয়তো তিনি পার পেয়ে গেছেন। একই ধরনের অপরাধে অন্যদের জেলহাজতে যেতে হয়, আর এখানে মদসহ আটকের পর যদি মুচলেকায় ছেড়ে দেওয়া হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক। এভাবে যদি আইনের প্রয়োগে বৈষম্য থাকে, তাহলে ফাইতংকে মাদকমুক্ত করা কঠিন হবে।”
ওই স্থানীয় বাসিন্দা আরও বলেন, “মাদক নির্মূল করতে হলে ব্যক্তি বা রাজনৈতিক পরিচয় নয়, অপরাধের ধরন বিবেচনা করে সবার ক্ষেত্রে একই আইন প্রয়োগ করতে হবে।”
তবে রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে মিউচিং মার্মাকে বিশেষ কোনো সুবিধা দেওয়া হয়েছে কি না, সে বিষয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। মুচলেকায় মুক্তির আইনগত কারণও এখনো স্পষ্ট নয়।
স্থানীয় বাসিন্দারা ফাইতংয়ে চোলাই মদ তৈরি, বিক্রি ও সরবরাহের অভিযোগগুলো তদন্তের পাশাপাশি মদসহ আটকের ঘটনায় নেওয়া আইনগত পদক্ষেপও স্পষ্ট করার দাবি জানিয়েছেন। তাদের প্রত্যাশা, রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত পরিচয় বিবেচনা না করে মাদকবিরোধী আইন সবার ক্ষেত্রে সমভাবে প্রয়োগ করা হবে।