Cox News

টেকনাফে কমছে বন্য হাতির বিচরণ, খাদ্য সংকটে বাড়ছে বিলুপ্তির শঙ্কা

এক সময় কক্সবাজারের টেকনাফ বনাঞ্চলে নিয়মিত দেখা মিলত বন্য হাতির পাল। কিন্তু বন উজাড়, পাহাড় কাটা, করিডোর দখল, রোহিঙ্গা ক্যাম্পসহ বিভিন্ন স্থাপনার বিস্তার এবং খাদ্য সংকটে দিন দিন কমছে হাতির বিচরণ। বন বিভাগ ও পরিবেশবিদরা বলছেন, কার্যকর সংরক্ষণ ব্যবস্থা না নিলে এ অঞ্চলে বন্য হাতির অস্তিত্ব আরও হুমকির মুখে পড়বে। স্থানীয়দের ভাষ্য, বনাঞ্চলে পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক খাদ্য না থাকায় হাতির দল প্রায়ই খাবারের সন্ধানে লোকালয়ে চলে আসে। এতে ফসল ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি মানুষ-হাতির সংঘাতও বাড়ছে। অনেক সময় লোকালয়ে আসা হাতিগুলোকে অপুষ্ট ও দুর্বল অবস্থায় দেখা যায়। সম্প্রতি টেকনাফের নাইট্যাংপাড়া পাহাড়ি এলাকায় খাদ্যের সন্ধানে এসে একটি বন্য মা হাতি পাহাড় থেকে পড়ে মারা যাওয়ার ঘটনা পরিস্থিতির ভয়াবহতাকে আরও স্পষ্ট করেছে। স্থানীয় পরিবেশকর্মী মোহাম্মদ ইদ্রিস আলী বলেন, একসময় টেকনাফের বনাঞ্চলে ১৫ থেকে ২০টি হাতির একাধিক পাল নিয়মিত বিচরণ করত। প্রায় ১১-১২ বছর আগেও এসব হাতির অবাধ চলাচল ছিল সাধারণ দৃশ্য। কিন্তু বনভূমি ধ্বংস, অবৈধ দখল, পাহাড় কাটা এবং খাদ্য সংকটের কারণে এখন সেই দৃশ্য অনেকটাই হারিয়ে গেছে। তিনি বলেন, বনাঞ্চলে হাতির স্বাভাবিক চলাচলের পথ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় তারা পর্যাপ্ত খাদ্য সংগ্রহ করতে পারছে না। ফলে মানুষ-হাতির সংঘাতও বাড়ছে। স্থানীয় শিক্ষক মাস্টার ইলিয়াস বলেন, হাতির আবাসস্থল ও চলাচলের করিডোর সংরক্ষণ, বন উজাড় বন্ধ, পাহাড় ধ্বংস রোধ, হাতির উপযোগী খাদ্যগাছ রোপণ, অবৈধ দখল উচ্ছেদ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে বন্য হাতি সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। স্থানীয় বাসিন্দা নজরুল ইসলাম বলেন, বন বিভাগ, প্রশাসন, পরিবেশবাদী সংগঠন ও স্থানীয় জনগণকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। একই সঙ্গে আহত বা বিপদগ্রস্ত হাতির দ্রুত উদ্ধার এবং নিয়মিত নজরদারি জোরদার করা প্রয়োজন। টেকনাফ রেঞ্জের বন কর্মকর্তা আব্দুর রশিদ জানান, আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংঘ (আইইউসিএন) পরিচালিত ২০১৬ সালের জরিপ অনুযায়ী, কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের আওতাধীন এলাকায় বর্ষাকালে ৪৮টি এবং গ্রীষ্মকালে গড়ে ৭৮টি বন্য হাতির চলাচল রেকর্ড করা হয়েছিল। তবে বর্তমানে কতটি হাতি রয়েছে বা বিচরণ করছে, সে বিষয়ে হালনাগাদ কোনো তথ্য নেই। কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, হাতির খাদ্য নিশ্চিত করতে বন বিভাগ বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় খাদ্য উপযোগী বাগান তৈরি করছে। তবে হাতির চলাচলের ঐতিহ্যবাহী করিডোরগুলো এখন আগের মতো নেই। যেসব এলাকায় হাতি চলাচল করত, সেখানে এখন রোহিঙ্গা ক্যাম্প, রেললাইন ও বিভিন্ন স্থাপনা গড়ে উঠেছে। তিনি বলেন, একটি বন্য হাতি প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে এবং প্রায় ২০০ কেজি খাদ্য গ্রহণ করে। কিন্তু উখিয়া-টেকনাফে এখন টানা ২০ কিলোমিটার বিস্তৃত এমন বনাঞ্চল নেই। ফলে হাতির দল বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে এবং খাদ্য সংকট আরও তীব্র হয়েছে। ডিএফও আরও জানান, অতীতে হাতিগুলো নাফ নদী পেরিয়ে মিয়ানমারে যাতায়াত করত। কিন্তু বর্তমানে সীমান্তে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা তৈরি হওয়ায় সেই প্রাকৃতিক চলাচলের পথ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। মানুষ-হাতি সংঘাত কমাতে বন বিভাগ ২৭টি ‘এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিম’ (ইআরটি) গঠন করেছে। পাশাপাশি নতুন করে বন্য হাতির সংখ্যা ও অবস্থান নির্ধারণে জরিপ কার্যক্রমও শুরু হয়েছে। কক্সবাজারের শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মিজানুর রহমান বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে হাতির জন্য আলাদা কোনো করিডোর নেই। একসময় হাতিগুলো বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে স্বাভাবিকভাবে চলাচল করলেও বর্তমানে সীমান্তের কাঁটাতার ও ল্যান্ডমাইনের কারণে সেই পথ কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস. এম. অনীক চৌধুরী বলেন, হাতির চলাচলে কেউ বাধা সৃষ্টি করলে বা ক্ষতির চেষ্টা করলে প্রশাসন তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেবে। হাতির করিডোর সংরক্ষণের বিষয়টি সমন্বয় সভায় আলোচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

টেকনাফে কমছে বন্য হাতির বিচরণ, খাদ্য সংকটে বাড়ছে বিলুপ্তির শঙ্কা