অসুস্থতার কাছে হার মানল পারিবারিক বন্ধন: পথে ফেলে গেল স্বজন
যে স্ত্রী-সন্তানের সুখের জন্যে দীর্ঘ ১০ বছর প্রবাসে কাটিয়েছেন, সেই স্ত্রী-সন্তানেরাই অসুস্থ জামাল উদ্দিনকে (৫০) রাতের বেলা পথের পাশে ফেলে রেখে চলে গেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। গত শনিবার দিবাগত রাতে টাঙ্গাইলের সখীপুর উপজেলার কালমেঘা এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। তবে রোববার দিনের বেলায় ফেলে যাওয়ার বিষয়টি সবার নজরে আসে। ঘটনাটি এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। অসুস্থ জামাল উদ্দিন উপজেলার কালমেঘা গ্রামের ফজর আলীর ছেলে।
জামালের পরিবার ও স্থানীয় বাসিন্দা সূত্রে জানা গেছে, জামাল উদ্দিন প্রায় ২৫ বছর আগে পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রি করে গ্রাম ছেড়ে গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার বাঁশবাড়ি গ্রামে শ্বশুরবাড়িতে বসবাস শুরু করেন। পরে তিনি সৌদি আরবে গিয়ে প্রায় ১০ বছর চাকরি করেছেন। তাঁদের সংসারে রায়হান (২২) ও মীম (১৯) নামের দুটি সন্তানও রয়েছে। সন্তানদের বিয়ে হয়েছে।
স্থানীয়রা দাবি করেন, জামাল তাঁর প্রবাসজীবনের উপার্জিত সব টাকা স্ত্রী-সন্তানের কাছে পাঠিয়েছেন। মাস চারেক আগে দেশে ফিরে স্ত্রীর নানান অপকর্ম তাঁর কাছে ধরা পড়ে। এ নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর বিবাদের একপর্যায়ে আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁদের ছাড়াছাড়ি হয়। পরে জামাল তাঁর ছেলের সঙ্গে গাজীপুরে বসবাস করতে থাকেন। সেখানে তাঁর কিডনি জটিলতাসহ নানা শারীরিক ধরা পড়ে। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসা ও দেখভালের অবহেলার কারণে একাই নিজ এলাকা সখীপুরের কালমেঘায় চলে আসেন।
স্থানীয়রা পুনরায় জামালকে শ্রীপুরের বাঁশবাড়িতে স্ত্রী-শ্বাশুড়ির কাছে পাঠায়। কিন্তু স্ত্রী তাঁকে গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানালে ওই গাড়িতেই তাঁকে সখীপুরে ফেরত পাঠানো হয়। গাড়ি চালক জামালকে রাতের বেলা কালমেঘা গ্রামে তাঁর পৈতৃক বাড়ির সামনে ফেলে রেখে সটকে পড়েন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, শনিবার গভীর রাতে জামাল উদ্দিনকে তাঁর পৈতৃক ভিটার পাশের সড়কে ফেলে রেখে যাওয়া হয়। পরে রাতে বৃষ্টি শুরু হলে তিনি মানবেতর অবস্থায় পড়েন। পরবর্তীতে কালমেঘা গ্রামের উত্তর-পূর্ব পাড়ায় তাঁর ভাতিজি ইসমতারার বাড়িতে নেওয়া হয়।
স্থানীয় ইউপি সদস্য মোশাররফ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, বিষয়টি জানার পর স্থানীয়রা এগিয়ে এসে জামাল উদ্দিনকে নিরাপদ স্থানে নিয়ে আসেন।
আজ সোমবার বিকেলে জামাল উদ্দিনের বড় ভাই সোহরাব আলী বলেন, ‘আমার ভাইকে আমি অনেক আগেই সাবধান করেছিলাম শ্বশুরবাড়িতে না যেতে। কিন্তু সে এলাকার কারও কথা শোনেনি। আজ তাঁর এই অবস্থা। পৃথিবীতে এর চেয়ে আর কষ্টের জীবন কী হতে পারে?’
আজ সোমবার বিকেলে গিয়ে দেখা গেছে, জামাল বর্তমানে তাঁর ভাইয়ের বাড়িতেই আশ্রয় পেয়েছেন। তিনি খুবই অসুস্থ, কোনো কথা বলতে পারেন না। সারা দিনে অল্প একটু জুস পান করেছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত স্ত্রী রিনা আক্তার বলেন, ‘আমার স্বামীকে আমি কয়েক মাস আগে ডিভোর্স দিয়েছি। তাঁর সঙ্গে এখন আর আমার কোনো সম্পর্ক নেই।’ রাতের বেলায় তিনি কীভাবে ওই এলাকায় পৌঁছালেন, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এ ব্যাপারে আমি কিছুই জানি না।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আশরাফুল আলম বলেন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তাকে বিষয়টি ইতিমধ্যেই জানানো হয়েছে। আশা করি আপাতত তাঁর থাকার ব্যবস্থা হবে।