প্রার্থী বাছাইয়ে বিএনপিতে জোর তৎপরতা, থাকছে চমক
ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের জন্য মেয়র প্রার্থী বাছাইয়ে জোর তৎপরতা চালাচ্ছে বিএনপি। যোগ্যদের বাছাই করতে এরই মধ্যে দুটি জরিপ হয়েছে। সম্ভাব্য প্রার্থীদের মাঠ পর্যায়ের জনপ্রিয়তা ও পরিচ্ছন্ন ইমেজকে প্রাধান্য দিয়ে দলীয় সমর্থনের বিষয় বিবেচনা করা হবে। দুই সিটি করপোরেশনেই মেয়র পদে নতুন মুখ আসতে পারে।
দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দুই সিটির নেতাদের সঙ্গে ইতোমধ্যে বৈঠক করেছেন। তিনি অভ্যন্তরীণ কোন্দল দূর করে সবার প্রতি ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচনী লড়াইয়ের প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ বিএনপির বর্তমান কমিটি রেখেই নির্বাচনের প্রস্তুতি নেওয়ার কথা বলেছেন তিনি। এ ছাড়া প্রতি ওয়ার্ডে কাউন্সিলর প্রার্থীদের মাঠে নামার সবুজ সংকেত দিয়েছেন।
সাংগঠনিক কার্যক্রমে গতি আনা, শৃঙ্খলা রক্ষা এবং তৃণমূল পর্যায়কে আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে ৪ জুলাই গুলশানের কার্যালয়ে পৃথকভাবে ঢাকা জেলা, মহানগর দক্ষিণ বিএনপি এবং কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবক দলের সঙ্গে বৈঠক করেন দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ১১ জুলাই তিনি বৈঠক করেন ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির নেতাদের সঙ্গে।
বৈঠকে অংশ নেওয়া একাধিক নেতা সমকালকে বলেন, দলের চেয়ারম্যান মহানগরের নেতাদের কাছে জানতে চেয়েছেন, জাতীয় নির্বাচনের পর সংগঠন কেন ঝিমিয়ে পড়েছে? কীভাবে এ সমস্যার সমাধান করা যায়? স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ঢাকা মহানগর বিএনপির প্রস্তুতি কেমন? ওয়ার্ড কাউন্সিলরসহ মেয়র পদে কোন কোন নেতার গ্রহণযোগ্যতা বেশি– তাও জানতে চান তারেক রহমান।
জবাবে মহানগর নেতারা জানান, নির্বাচনের পর দলীয় কোনো কর্মসূচি না থাকায় নেতাকর্মীদের মধ্যে একটু অলস ভাব দেখা যাচ্ছে। রাজপথে কোনো কর্মসূচি বা নির্বাচন এলে নেতাকর্মী ও সমর্থকরা ঝাঁপিয়ে পড়বেন।
দলীয় সূত্র জানায়, স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে এরই মধ্যে বিভিন্ন ব্যক্তি ও বেসরকারি সংগঠন দিয়ে মাঠ পর্যায়ে জরিপ করা হয়েছে। এসব জরিপের তথ্য বিবেচনা করছেন তারেক রহমান। জরিপের মাধ্যমে সারাদেশের ইউনিয়ন, পৌরসভা, উপজেলা ছাড়াও ১৩ সিটি করপোরেশনের মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীদের মধ্যে জনপ্রিয় ও যোগ্যদের বাছাই করা হচ্ছে।
বিএনপি নেতারা জানিয়েছেন, দলের চেয়ারম্যান দৃঢ়ভাবে বলেছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রভাব খাটিয়ে বা অনৈতিকভাবে কাউকে পাস করিয়ে আনার কোনো তৎপরতা চালানোর সুযোগ নেই। ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ বিএনপির নেতাদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকেও তিনি একই বার্তা দিয়েছেন। সবাইকে সতর্ক করে তিনি বলেছেন, দলকে ঐক্যবদ্ধ করতে না পারলে নির্বাচনে ভালো করা সম্ভব হবে না।
ঢাকায় মেয়র পদে থাকছে চমক
বিএনপির নীতিনির্ধারক পর্যায়ের একাধিক নেতা জানিয়েছেন, এবারের স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছেন তারা। এ জন্য প্রার্থী তালিকায় কোনো তদবির, স্বজনপ্রীতিকে গুরুত্ব দেওয়া হবে না। মাঠ পর্যায়ের জনপ্রিয়তা, পরিচ্ছন্ন ইমেজকে প্রাধান্য দিয়ে দলীয় সমর্থন দেওয়া হবে।
ঢাকা মহানগর বিএনপি নেতারা জানান, দলীয় প্রধান খুব ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিতে চাচ্ছেন। যোগ্যদের বাছাই করতে এরই মধ্যে দুটি জরিপ করা হয়েছে। নির্বাচনের আগে আরও কয়েক দফা এসব প্রক্রিয়া করা হবে। তবে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনেই নতুন মুখ, নতুন চমক দেখার সম্ভাবনা রয়েছে। ২০২০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ইশরাক হোসেন মেয়র পদে ধানের শীষ প্রতীকে অংশ নিয়েছিলেন। এর আগে ২০১৫ সালের নির্বাচনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস অংশ নিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে সংসদ সদস্য ইশরাক হোসেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী হয়েছেন। জরিপ প্রতিবেদনে নেতাকর্মী-বিচ্ছিন্ন বলে তাঁকে উপস্থাপন করা হয়েছে। এদিকে সংসদ সদস্য মির্জা আব্বাস দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ। বর্তমানে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুস সালাম।
এই সিটিতে জামায়াত ও এনসিপি তরুণদের প্রার্থী করতে চাচ্ছে। তাই বিএনপি নেতারাও অপেক্ষাকৃত তরুণ ও পরিচ্ছন্ন ইমেজের একজনকে সমর্থন দেওয়ার পক্ষে। জরিপ প্রতিবেদনেও এমন মত দেওয়া হয়েছে। বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানও এমনটা চাচ্ছেন। এই সিটিতে মেয়র পদে দলের সমর্থন নিয়ে চমক আসছে বলে মনে করছেন অনেকেই।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ২০১৫ ও ২০২০ সালে বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য তাবিথ আউয়ালকে মেয়র পদে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল। তবে এবার অন্য কাউকে প্রার্থী করা হবে বলে সূত্র জানিয়েছে। এই সিটির বর্তমান প্রশাসক শফিকুল ইসলাম মিল্টনকে প্রার্থী করা হতে পারে বলে ধারণা করছেন অনেকে। জরিপেও তাঁর নাম এগিয়ে রয়েছে বলে জানা গেছে। তবে এ বিষয়ে মহানগর নেতাদের কেউ প্রকাশ্যে কিছু বলতে রাজি হননি।
ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদে প্রার্থিতা বিষয়ে মহানগর নেতারা বলেন, বৈঠকে দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান ঢাকার প্রতিটি ওয়ার্ড সম্পর্কে জানতে চান। একই সঙ্গে ঢাকা মহানগরের নেতাদের পক্ষ থেকে প্রার্থী তালিকা নিয়ে কাজ করার পরামর্শ দেওয়া হয় বৈঠক থেকে। তারেক রহমান তাদের বলেন সাংগঠনিকভাবে ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদের বিষয়ে তালিকা দেওয়ার জন্য। এসব তালিকা সমন্বয় করে চূড়ান্ত তালিকা করা হবে বলে বৈঠক থেকে জানানো হয়েছে।
জানা গেছে, তারেক রহমানের নির্দেশনায় মহানগর নেতারা তাদের কাজ ইতোমধ্যে শেষ করেছেন। পরবর্তী বৈঠকের জন্য অপেক্ষা করছেন তারা। সেই বৈঠকে প্রার্থিতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে।
মহানগর নেতারা জানান, জামায়াত এক বছর আগে থেকেই তাদের প্রার্থী চূড়ান্ত করে মাঠে কাজ করছে। অন্যদিকে বিএনপিতে প্রায় প্রতিটি এলাকায় একাধিক সম্ভাব্য প্রার্থী তোড়জোড় শুরু করেছেন। এতে কর্মীদের মধ্যে এক ধরনের অনৈক্য তৈরি হয়েছে। কার পক্ষে কাজ করবেন– এ নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে আছেন অনেকে। তবে ঐক্যবদ্ধ থাকলে সহজেই স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জয় নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। এ কারণেই যথাসম্ভব আগেভাগে বিএনপির প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত করার প্রস্তুতি চলছে।
এ প্রসঙ্গে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সমকালকে বলেন, গণতান্ত্রিক দল হিসেবে আমাদের নির্বাচনের প্রস্তুতি রয়েছে। মাঝে কিছুদিন নির্বাচন না হওয়ায় একটা স্থবিরতা তৈরি হয়েছিল। নির্বাচন কমিশন তপশিল ঘোষণা করলেই আমরা অংশ নিতে প্রস্তুত।