Cox News

৩৫২ বন্দির কারাগারে দেড় হাজারের বেশি, ৯ দিনে তিন মৃত্যু

মাত্র নয় দিনের ব্যবধানে সিরাজগঞ্জ জেলা কারাগারের তিন বন্দির মৃত্যু হয়েছে চিকিৎসাধীন অবস্থায়। সর্বশেষ শনিবার ভোরে ঢাকার প্রিজন হাসপাতালে মারা যান ২২ বছর বয়সী কাওসার হোসেন। এর আগে ২৩ জুলাই ও ১৫ জুলাই আরও দুই বন্দির মৃত্যু হয়। ধারাবাহিক এই মৃত্যুর ঘটনায় সিরাজগঞ্জ জেলা কারাগারের চিকিৎসাসেবা ও বন্দিদের স্বাস্থ্যসুবিধা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। ৩৫২ জন বন্দির ধারণক্ষমতার এই কারাগারে বর্তমানে দেড় হাজারের বেশি বন্দি রয়েছেন। অথচ সেখানে কোনো স্থায়ী মেডিকেল অফিসার নেই। ডেপুটেশনে আসা একজন চিকিৎসক ও একজন ফার্মাসিস্টের ওপর নির্ভর করেই চলছে স্বাস্থ্যসেবা। কারা কর্তৃপক্ষ জানায়, নিহত কাওসার হোসেন তাড়াশ উপজেলার মাধাইনগর ইউনিয়নের ঝুরঝুরি গ্রামের সাইদুর রহমানের ছেলে। একটি হত্যা মামলায় গ্রেপ্তারের পর ২০২৪ সালের ১২ এপ্রিল থেকে তিনি কারাগারে ছিলেন। কারা হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘদিন জ্বরে ভোগার পর কাওসারের মস্তিষ্কের পর্দায় প্রদাহ বা সংক্রমণ (মেনিনজাইটিস) শনাক্ত হয়। গত ১৩ জুলাই তাকে সিরাজগঞ্জ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি হলে ১৫ জুলাই তাকে বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। পরে ১৮ জুলাই উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকার প্রিজন হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে শনিবার ভোরে তার মৃত্যু হয়। সিরাজগঞ্জ কারাগারের ডেপুটি জেলার ইকবাল মাহমুদ রুমান বলেন, অসুস্থ হওয়ার পর পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন হাসপাতালে কাওসারকে চিকিৎসা দেওয়া হয়। মৃত্যুর খবর তার পরিবারের সদস্যদের জানানো হয়েছে এবং ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে। সিরাজগঞ্জ কারা হাসপাতালের চিকিৎসক গোলাম রাব্বি খান বলেন, দীর্ঘদিন জ্বরে ভোগার কারণে কাওসারের মেনিনজাইটিস হয়েছিল বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়। সে কারণেই তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য একাধিক হাসপাতালে পাঠানো হয়। এর আগে গত ২৩ জুলাই চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান সদর উপজেলার রতনকান্দি ইউনিয়নের আওয়ামী লীগ নেতা বাবলু মণ্ডল (৫২)। এর আগে, ১৫ জুলাই মারা যান শাহজাদপুরের ইউনিয়ন যুবলীগ নেতা আমিনুল ইসলাম লিটন (৪৭)। এ ছাড়া গত প্রায় পৌনে দুই বছরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও দুজন কারাবন্দির মৃত্যু হয়েছে বলে কারা সূত্র জানিয়েছে। তারা হলেন- পৌর আওয়ামী লীগের বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক আতাউর রহমান আঙ্গুর এবং নিষিদ্ধ ঘোষিত এনায়েতপুর থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি আহমেদ মোস্তফা বাচ্চু। চিকিৎসাসেবা নিয়ে প্রশ্ন স্বজনদের কাওসারের পাশাপাশি অন্য দুই বন্দির মৃত্যুর ঘটনাও চিকিৎসাসেবা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে নিহতদের স্বজনদের একাংশ। বাবলু মণ্ডলের ছেলে রাসেল আহমেদ বলেন, তার বাবার আগে থেকে শ্বাসকষ্টের কোনো সমস্যা ছিল না। কিন্তু মৃত্যুর পর কারা কর্তৃপক্ষ শ্বাসকষ্টের কথা জানিয়েছে। অসুস্থতার বিষয়েও পরিবারকে আগে অবহিত করা হয়নি বলে অভিযোগ তার। বাবলুর ভাতিজা রেজাউল ইসলাম বলেন, মৃত্যুর আগের সপ্তাহেও তিনি কারাগারে দেখা করতে গিয়ে বাবলু মণ্ডলকে স্বাভাবিক অবস্থায় দেখেছেন। তখন শ্বাসকষ্টের কোনো লক্ষণ তার চোখে পড়েনি। ধারণক্ষমতার চার গুণ বন্দি সিরাজগঞ্জ জেলা কারাগারের ধারণক্ষমতা ৩৫২ জন। কিন্তু বর্তমানে সেখানে বন্দি রয়েছেন দেড় হাজারেরও বেশি। এত বিপুলসংখ্যক বন্দির জন্য নেই কোনো স্থায়ী চিকিৎসক। কাজিপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে ডেপুটেশনে আসা একজন চিকিৎসক নির্দিষ্ট সময়ে দায়িত্ব পালন করেন। কারাগারে এমআরআইসহ জটিল রোগ নির্ণয়ের আধুনিক সুবিধাও নেই। ফলে মস্তিষ্কের প্রদাহ, স্ট্রোক বা অন্যান্য জটিল রোগ দ্রুত শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। সিরাজগঞ্জের সিভিল সার্জন মোহাম্মদ নুরুল আমিন বলেন, কারা কর্তৃপক্ষের অনুরোধে একজন চিকিৎসক ডেপুটেশনে দায়িত্ব পালন করছেন। তবে স্থায়ী চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্য ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নীতিগত সিদ্ধান্ত ও নতুন পদ সৃষ্টির প্রয়োজন। জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, কাওসারের মৃত্যুর তথ্য তারা ঢাকার প্রিজন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে জেনেছেন। সরকারি বিধি অনুযায়ী কারাগারে একজন চিকিৎসক দায়িত্ব পালন করছেন। চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ এখন পর্যন্ত জেলা প্রশাসনের কাছে কেউ করেননি। মাত্র নয় দিনে তিন বন্দির মৃত্যু এবং ধারণক্ষমতার চার গুণের বেশি বন্দির উপস্থিতির প্রেক্ষাপটে কারাগারের চিকিৎসাব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, স্থায়ী চিকিৎসক নিয়োগ, জরুরি স্বাস্থ্যসেবা এবং আধুনিক রোগনির্ণয় সুবিধা নিশ্চিত না হলে এমন ঘটনা ভবিষ্যতেও ঘটতে পারে।

৩৫২ বন্দির কারাগারে দেড় হাজারের বেশি, ৯ দিনে তিন মৃত্যু