কিডনি বিক্রি করে প্রতারণার শিকার, আদালতে মামলা
জয়পুরহাটে কিডনি বিক্রির পর টাকা না পেয়ে প্রতারণার অভিযোগে ১০ জনের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেছেন মন্টু মিয়া নামে এক দিনমজুর। আদালতের নির্দেশে মামলাটি এফআইআর হিসেবে রেকর্ড করেছে কালাই থানার পুলিশ।
মন্টু মিয়ার (৪৬) বাড়ি পার্শ্ববর্তী গাইবান্ধা জেলার গোবিন্দগঞ্জ পৌরশহরে। গত ১৩ জুন জয়পুরহাটের আমলি আদালত-৫ এ তিনি মামলার আবেদন করেন। আদালতের নির্দেশে পরদিন এটি এফআইআর হিসেবে রেকর্ডভুক্ত হয়।
মামলায় ছয়জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরও ৩-৪ জনকে আসামি করা হয়। আসামিরা হলেন– বগুড়া সদর উপজেলার নিশিন্দারা গ্রামের সাব্বির আহমেদ, শিবগঞ্জ উপজেলার কিচক মল্লিকপাড়া গ্রামের সুমন আলী, জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার উদয়পুর ইউনিয়নের পাইকপাড়া গ্রামের আব্দুল মান্নান ও সাইদুর রহমান, লওনা গ্রামের আব্দুস ছাত্তার এবং নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার ছোট হোসেনপুর রাজাগঞ্জ এলাকার তারেক আজম ওরফে বাবলু চৌধুরী। তাদের মধ্যে তারেক আজম কিডনির অবৈধ ক্রয়-বিক্রয়ের মহাজন হিসেবে পরিচিত। তিনি রাজধানীর রায়েরবাগ এলাকায় থেকে জয়পুরহাটে দালালদের মাধ্যমে দরিদ্র মানুষদের টাকার প্রলোভন দেখিয়ে কিডনি ক্রয়-বিক্রয় করেন বলে অভিযোগ আছে।
মন্টু মিয়া সমকালকে বলেন, ১০ লাখ টাকার লোভ দেখিয়ে গত জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে তাঁকে নেপালে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর হাসপাতালে নিয়ে তাঁর একটি কিডনি অন্য এক গ্রহীতার শরীরে প্রতিস্থাপন করা হয়। পরে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। তখন তাঁকে মাত্র ৫০ হাজার টাকা দেওয়া হয়। চুক্তি অনুযায়ী তাঁকে বাকি ৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা পরিশোধে বিভিন্ন অজুহাতে কালক্ষেণ করে মামলার আসামিরা। তাই প্রতারিত হয়ে তিনি আদালতের শরণাপন্ন হয়েছেন।
মামলার আরজিতে বাদী উল্লেখ করেন, সংসারের অভাব-অনটন মেটাতে বিভিন্ন এনজিও ও স্থানীয় ব্যক্তিদের কাছ থেকে ঋণ নিয়েছিলেন তিনি। টাকা নেওয়ার পর সময়মতো কিস্তি পরিশোধ করতে না পারায় তিনি চরম আর্থিক সংকটে পড়েন। সমস্যার কূলকিনারা করতে পারছিলেন না। এই সুযোগে স্থানীয় কিছু দালাল (মামলার আসামি) তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করে এবং একটি কিডনি বিক্রির প্রস্তাব দেয়। সে সময় তাঁকে জানানো হয়, ঢাকার এক নারী কিডনি জটিলতায় ভুগছেন এবং তাঁর জন্য জরুরি ভিত্তিতে কিডনির প্রয়োজন। তিনি রাজি হলে তাঁকে একটি কিডনির বিনিময়ে ১০ লাখ টাকা দেওয়া হবে। প্রথমে তিনি ভয় পেয়ে যান। কিন্তু দালালরা তাঁকে বিভিন্নভাবে বুঝিয়েসুঝিয়ে মন গলিয়ে ফেলে। শেষে পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতার কথা ভেবে নিজের শারীরিক ক্ষতির আশঙ্কা সত্ত্বেও মন্টু মিয়া প্রস্তাবে রাজি হয়ে যান।
মন্টু মিয়ার অভিযোগ, দালালদের প্রস্তাবে রাজি হওয়ার পর আসামিরা তাঁর পাসপোর্ট তৈরি করে দেয় এবং চলতি বছরের জানুয়ারির শুরুতে চুক্তির বাইরে ৫০ হাজার টাকা দেয়। এর কয়েক দিন পর তাঁকে নেপালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে একটি হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তাঁর একটি কিডনি ট্রান্সফার করা হয়। অস্ত্রোপচারের পর কিছুদিন চিকিৎসা দিয়ে তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। এরপর চুক্তির ১০ লাখ টাকার মধ্যে মাত্র ৫০ হাজার টাকা দেওয়া হয়। বাকি ৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা আর দেওয়া হয়নি। পরে স্থানীয় কয়েকজন লোকের মাধ্যমে ওই টাকা পাওয়ার জন্য অভিযুক্তদের অনুরোধ করা হলেও তারা উল্টো অর্থ লেনদেনের বিষয়টি অস্বীকার করেন।
মন্টু মিয়ার পরিবারের সদস্যদের দাবি, কিডনি দেওয়ার পর থেকে তিনি (মন্টু) আগের মতো কাজকর্ম করতে পারেন না। সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হওয়ায় তারা এখন চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন। তারা ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত করে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন।
সিভিল সার্জন ডা. আল মামুন আজ মঙ্গলবার সমকালকে বলেন, যে কোনো সুস্থ মানুষের একটি কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হলে বা কেটে বাদ দিলে অন্য কিডনিটি বেশি কাজ করার কারণে আকারে বড় হয়ে যায়। এতে দেখা দিতে পারে শারীরিক নানা জটিলতা। এ ছাড়া বাকি জীবনও থাকে ঝুঁকির মধ্যে।
জয়পুরহাট আদালতের আইনজীবী উজ্জ্বল হোসেন বলেন, মানুষের দারিদ্র্য, অসহায়ত্ব বা আর্থিক সংকটকে পুঁজি করে যদি কাউকে বিদেশে নিয়ে প্রতারণার মাধ্যমে কিডনি ট্রান্সফার করা হয়, তাহলে এটি শুধু প্রতারণা নয়, অত্যন্ত জঘন্য ও সংগঠিত অপরাধ। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত হওয়া উচিত বলে তিনি মনে করেন।
কালাই থানার ওসি রফিকুল ইসলাম বলেন, আদালতের নির্দেশে মানবদেহে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন আইন, ১৯৯৯ এর আওতায় মামলাটি নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পরস্পরের যোগসাজশে হত্যার উদ্দেশ্যে মানব দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কর্তন, প্রতারণা করে অর্থ আত্মসাৎ ও হুকুমদানের অপরাধের অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিষয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।