রোহিঙ্গাদের দখলে শ্রমবাজার ও ব্যবসা সহ প্রশাসন,স্থানিয়দের মানবেতর জীবন যাপন।
এম গফুর উদ্দিন চৌধুরী:“পাটি নাইদে বেডা মাঝে ঘুমাইত চায়” “মেহমানকে শুইতে দিয়ে মালিক বাহিরে ঘুমায়” চট্রগ্রামের আঞ্চলিক প্রবাদ কথাটি আমাদের গ্রামীণ সংস্কৃতির চিরন্তন অতিথি পরায়ণতা, উদারতা ও আত্মত্যাগের এক অনন্য প্রতীক। বাংলাদেশ ও বাঙালির ঐতিহ্য মানেই অতিথি আপ্যায়ন। “অতিথি দেবতুল্য” এই সনাতন ধারণার ওপর ভিত্তি করেই এ দেশের সমাজ ও সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। বাড়ির গৃহকর্তা বা মালিক নিজে শত কষ্ট সহ্য করে মেহমানের আরামের সব ব্যবস্থা নিশ্চিত করেন। মেহমানকে ঘরের সবচেয়ে ভালো বিছানাটি ছেড়ে দিয়ে নিজে বারান্দায়, দালানে বা ঘরের বাইরে মাদুর পেতে ঘুমান এমন দৃশ্য বাঙালি সমাজে চিরচেনা। ঠিক তেমনি এক অনন্য নজির হলো রোহিঙ্গা। বাংলাদেশ এক মানবিক উদারতার ইতিহাস তৈরি করেছিল ২০১৭ সালে, যখন মায়ানমারের সামরিক জান্তার নির্মম নির্যাতনের শিকার লাখ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দেওয়া হয়েছিল। কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের স্থানীয় অধিবাসীরা নিজেদের জমি, বনভূমি এবং সীমিত সম্পদ বিলিয়ে দিয়ে এই বিপন্ন মানবতার পাশে দাঁড়িয়েছিল। তবে সময়ের পরিক্রমায় সেই মানবিক আশ্রয়ের মানবিক মূল্য চুকাতে হচ্ছে উখিয়ার স্থানীয় অধিবাসীদের। বর্তমান উখিয়ার শ্রমবাজার এবং স্থানীয় পরিবহন খাত সম্পূর্ণভাবে রোহিঙ্গাদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। স্থানীয়দের চেয়ে অনেক কম মজুরিতে কাজ করার মানসিকতার কারণে স্থানীয় শ্রমজীবী মানুষ আজ কর্মহীন। ফলে উখিয়ার আদি বাসিন্দারা নিজেদের ভূমিতেই আজ চরম অর্থনৈতিক সংকট ও মানবেতর জীবনযাপনে বাধ্য হচ্ছে।ভৌগোলিক প্রেক্ষাপট ও শরণার্থী সংকটের চাপ: উখিয়া উপজেলার পালংখালীসহ বিভিন্ন ইউনিয়নে বিশাল এলাকা জুড়ে এখন রোহিঙ্গা ক্যাম্পের অবস্থান। এই অঞ্চলের মোট স্থানীয় জনসংখ্যার চেয়ে রোহিঙ্গা শরণার্থীর সংখ্যা কয়েক গুণ বেশি। এই বিপুল জনসংখ্যার চাপ উখিয়ার সীমিত অবকাঠামো, বনভূমি, পরিবেশ এবং সর্বোপরি স্থানীয় অর্থনীতিকে এক অভাবনীয় সংকটের মুখে ফেলেছে। শুরুতে আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থাগুলোর মানবিক কার্যক্রম স্থানীয় অর্থনীতিতে কিছুটা গতি আনলেও, দীর্ঘমেয়াদে তা স্থানীয় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের জন্য আশীর্বাদের চেয়ে অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।শ্রমবাজারের বর্তমান চিত্র এবং কম মজুরির ফাঁদ: উখিয়ার অর্থনীতি মূলত কৃষি, দিনমজুরি, লবণ উৎপাদন এবং মৎস্য খাতের ওপর নির্ভরশীল ছিল। রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের পর এই পুরো শ্রমবাজারের চিত্র বদলে গেছে। ক্যাম্পের বাইরে রোহিঙ্গাদের কাজ করা আইনত নিষিদ্ধ হলেও, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার রোহিঙ্গা শ্রমিক স্থানীয় শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে। এর প্রধান কারণ হলো মজুরির বিশাল বৈষম্য। একজন স্থানীয় দিনমজুর যেখানে দৈনিক ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা মজুরি দাবি করেন, সেখানে একজন রোহিঙ্গা শ্রমিক মাত্র ৩০০ থেকে ৪০০ টাকায় একই কাজ করতে প্রস্তুত থাকে। রোহিঙ্গারা যেহেতু আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো থেকে রেশন, ঘর, চিকিৎসা এবং অন্যান্য মৌলিক সুযোগ-সুবিধা বিনামূল্যে পাচ্ছে, তাই স্থানীয় বাজারে যেকোনো অল্প মজুরিতে কাজ করা তাদের জন্য অতিরিক্ত লাভ বা নগদ উপার্জনের মাধ্যম। অন্যদিকে, স্থানীয় শ্রমিকদের এই মজুরি দিয়েই চাল, ডাল, তেল, সন্তানের পড়াশোনা এবং চিকিৎসা খরচ চালাতে হয়। ফলে, কম খরচে অধিক মুনাফার আশায় স্থানীয় ব্যবসায়ী, প্রভাবশালী ব্যক্তি ও ঠিকাদাররা স্থানীয় শ্রমিকদের বাদ দিয়ে রোহিঙ্গা শ্রমিকদের কাজে নিয়োগ করছে।কৃষি ও নির্মাণ খাতের বিপর্যয়: উখিয়ার ঐতিহ্যবাহী কৃষি খাত এখন পুরোপুরি রোহিঙ্গা শ্রমিকদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। ধান চাষ, পানের বরজ, এবং সবজি উৎপাদনে স্থানীয় কৃষকরা কম খরচের কারণে রোহিঙ্গাদের বেছে নিচ্ছেন। এর ফলে স্থানীয় ভূমিহীন কৃষি শ্রমিকরা সম্পূর্ণ বেকার হয়ে পড়েছেন। একইভাবে, উখিয়ার সরকারি-বেসরকারি নির্মাণ খাত, যেমন- রাস্তাঘাট নির্মাণ, বহুতল ভবন তৈরি এবং ক্যাম্পের ভেতরের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজে ঠিকাদাররা দেদারসে রোহিঙ্গা শ্রমিক ব্যবহার করছে। স্থানীয় যুবসমাজ যারা একসময় রাজমিস্ত্রি বা জোগালি হিসেবে কাজ করে সংসার চালাত, তারা এখন কাজের সন্ধানে উখিয়া ছেড়ে অন্য জেলায় পাড়ি জমাতে বাধ্য হচ্ছে।পরিবহন খাতের নিয়ন্ত্রণ এবং স্থানীয় চালকদের উচ্ছেদ: উখিয়ার শ্রমবাজারের পর সবচেয়ে বড় আঘাত এসেছে পরিবহন খাতে। উখিয়ার প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে ক্যাম্পের ভেতরের সংযোগ সড়কগুলোতে চলাচলকারী সিএনজিচালিত অটোরিকশা, টমটম (ইজিবাইক), মাহিন্দ্রা এবং ডাম্পার (মিনি ট্রাক) চালকদের সিংহভাগই এখন রোহিঙ্গা। ক্যাম্পের ভেতরের কিছু প্রভাবশালী চক্র এবং স্থানীয় কতিপয় দালালের সহায়তায় রোহিঙ্গারা ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরি করে বা কোনো পরিচয়পত্র ছাড়াই এসব যানবাহন চালাচ্ছে। অনেক সময় দেখা যায়, স্থানীয় মালিকরা কম চালকের বেতনে বা দৈনিক জমার বেশি টাকার আশায় রোহিঙ্গাদের হাতে গাড়ির চাবি তুলে দিচ্ছে। রোহিঙ্গারা ট্রাফিক আইন না মেনে বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানোর ফলে উখিয়ার সড়কগুলোতে দুর্ঘটনা নিত্যদিনের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, রোহিঙ্গাদের এই আধিপত্যের কারণে স্থানীয় বৈধ লাইসেন্সধারী চালকরা কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন। তারা ভাড়ার প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছেন না, কারণ রোহিঙ্গারা যেকোনো কম ভাড়ায় যাত্রী পরিবহন করতে দ্বিধা করে না।স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মানবেতর জীবনযাপন ও সামাজিক প্রভাব : কাজের অভাব এবং আয়ের উৎস বন্ধ হয়ে যাওয়ায় উখিয়ার মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোর জীবনযাত্রা এখন চরম বিপর্যস্ত। অনেক পরিবার দিনে দুই বেলা ঠিকমতো খেতে পারছে না। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এই বাজারে আয়শূন্য হয়ে পড়ায় স্থানীয় মানুষ ঋণের জালে জড়িয়ে পড়ছে। সন্তানদের স্কুল-কলেজে পাঠানো বন্ধ করে দিতে বাধ্য হচ্ছে অনেক পরিবার। এর সামাজিক প্রভাব আরও সুদূরপ্রসারী। স্থানীয় বেকার যুবকদের মধ্যে চরম হতাশা সৃষ্টি হচ্ছে, যা তাদের মাদক চোরাচালান (বিশেষ করে ইয়াবা ও আইস), চুরি, ছিনতাই এবং অন্যান্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ক্যাম্পের ভেতর সক্রিয় সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর সাথে স্থানীয় কিছু বেকার যুবকের যোগাযোগ গড়ে উঠছে, যা পুরো অঞ্চলের আইনশৃঙ্খলার জন্য এক বিরাট হুমকি। উখিয়ার মানুষ এখন নিজেদের এলাকায় নিজেদের পরবাসী মনে করছে, যা তাদের মনে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষের জন্ম দিচ্ছে।মানবিক সহায়তার অসম বণ্টন ও বৈষম্য: উখিয়ার স্থানীয়দের ক্ষোভের আরেকটি বড় কারণ হলো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর (ওঘএঙ এবং ঘএঙ) ভূমিকার বৈষম্য। ক্যাম্পগুলোতে কোটি কোটি টাকার ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ করা হয়, অথচ তার ঠিক পাশেই থাকা স্থানীয় দরিদ্র পরিবারগুলো কোনো ধরনের সহায়তা পায় না। যদিও নিয়ম রয়েছে যে মানবিক কাজের অন্তত ২৫-৩০ শতাংশ স্থানীয় জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে ব্যয় করতে হবে, বাস্তবে তার প্রয়োগ অত্যন্ত সীমিত। স্থানীয় তরুণরা আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোতে চাকুরির ক্ষেত্রেও বৈষম্যের শিকার হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।উত্তরণের উপায় ও সুপারিশ: উখিয়ার স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে এই মানবেতর জীবন থেকে রক্ষা করতে এবং শ্রমবাজারকে পুনরায় স্থানীয়দের নিয়ন্ত্রণে ফিরিয়ে আনতে জরুরি ভিত্তিতে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন-১. ক্যাম্পের নিরাপত্তা জোরদার: রোহিঙ্গারা যাতে কোনোভাবেই ক্যাম্পের বাইরে এসে শ্রমবাজারে অংশ নিতে না পারে, সেজন্য ক্যাম্পের প্রবেশপথ ও সীমানায় কাঁটাতারের বেড়া এবং সিসিটিভি নজরদারি কঠোর করতে হবে। এপিবিএন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর টহল বাড়াতে হবে।২. নিয়োগকর্তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা: যেসব স্থানীয় প্রভাবশালী, ব্যবসায়ী বা ঠিকাদার আইন অমান্য করে কম মজুরিতে রোহিঙ্গা শ্রমিক নিয়োগ করছে, তাদের চিহ্নিত করে মোটা অঙ্কের জরিমানা ও শাস্তির আওতায় আনতে হবে।৩. পরিবহন খাতে কঠোর নজরদারি: সড়ক ও মহাসড়কে যৌথ অভিযানের মাধ্যমে লাইসেন্সবিহীন রোহিঙ্গা চালকদের আটক এবং যানবাহন বাজেয়াপ্ত করতে হবে। স্থানীয় মালিকদের সতর্ক করতে হবে যাতে তারা কোনো রোহিঙ্গাকে গাড়ি ভাড়া না দেয়। ৪. বিশেষ অর্থনৈতিক সহায়তা: উখিয়ার ক্ষতিগ্রস্ত স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী (যেমন: ওএমএস, খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি) জোরদার করতে হবে। স্থানীয় বেকার যুবকদের জন্য সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করে আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে।৫. আন্তর্জাতিক সংস্থার জবাবদিহিতা: আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা ও এনজিওগুলোকে স্থানীয় এলাকার উন্নয়নে এবং স্থানীয়দের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে আরও বেশি দায়বদ্ধ হতে হবে।উখিয়ার মানুষ যে মানবিকতার পরিচয় দিয়েছিল, তার প্রতিদান হিসেবে তাদের জীবন আজ বিপন্ন। কম মজুরির রোহিঙ্গা শ্রমের সস্তা বাজার উখিয়ার অর্থনীতিকে সাময়িকভাবে চাঙ্গা দেখালেও, তা স্থানীয় সমাজব্যবস্থাকে ভেতর থেকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। একটি দেশের নাগরিকরা যখন নিজ ভূমিতেই বহিরাগতদের কারণে কর্মহীন ও ক্ষুধার্ত থাকে, তখন তা জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। তাই আর সময় নষ্ট না করে, উখিয়ার শ্রমবাজার ও পরিবহন খাতকে পুরোপুরি রোহিঙ্গাদের মুক্ত করে স্থানীয়দের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। সরকারের দৃঢ ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং স্থানীয় প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপই পারে উখিয়ার আদি বাসিন্দাদের এই মানবেতর জীবন থেকে মুক্তি দিতে।লেখক: মহাসচিব, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সংগ্রাম জাতীয় কমিটি ও চেয়ারম্যান পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদ, উখিয়া, কক্সবাজার।