নওগাঁর বদলগাছী উপজেলার অধিকাংশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নেই সংযোগ সড়ক। যেসব সড়ক রয়েছে, সেগুলোও কাদা ও জলাবদ্ধতায় পরিণত হয়েছে মরণফাঁদে—যেকোনো সময় ঘটতে পারে দুর্ঘটনা। এর প্রভাবে স্কুলবিমুখ হয়ে পড়ছে শিক্ষার্থীরা এবং পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়ছে তারা। একাধিকবার প্রশাসনকে অবগত করা হলেও কোনো সমাধান মেলেনি বলে অভিযোগ এলাকাবাসীর।
উপজেলার গাবনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি মূল পাকা সড়ক থেকে প্রায় ৩০০ মিটার দূরে। এই সরু পথ দিয়ে গাবনা গ্রামসহ পাশের গোধইল গ্রামের অন্তত ৭০ জন শিক্ষার্থী স্কুলে আসে। পথটি শুধু শিক্ষার্থীদের জন্যই নয়, স্কুলপাড়ার অন্তত দেড়শ পরিবারের প্রায় ৫০০ মানুষের চলাচলেরও একমাত্র মাধ্যম। শুষ্ক মৌসুমে পথটি শুকনো থাকলেও বর্ষায় অন্তত ছয় মাস জলাবদ্ধ থাকে। বিকল্প কোনো পথ না থাকায় হাঁটুসমান পানি মাড়িয়ে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও স্থানীয়দের প্রতিনিয়ত চলাচল করতে হচ্ছে। তুলনামূলক নিচু হওয়ায় সামান্য বৃষ্টিতেই এই সরু পথে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়, ফলে সন্তানদের স্কুলে পাঠিয়ে আতঙ্কে থাকতে হয় অভিভাবকদের এবং যাওয়া-আসার সময় তাদের সঙ্গে যেতে হয়।
জলাবদ্ধতার কারণে যাতায়াতের পথে অনেকে পানিতে পড়ে যায়, পোশাক ভিজে ও নোংরা হয়—এ কারণে অনেক অভিভাবক সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে অনীহা প্রকাশ করেন। পাশাপাশি পচা ও দুর্গন্ধযুক্ত পানিতে চলাচলের ফলে পায়ে চুলকানি ও ঘা হওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এসব কারণে শিক্ষার্থীদের স্কুলে উপস্থিতি কমে গেছে এবং তারা পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়ছে। বিদ্যালয়টির দুই পাশে থাকা দুটি পুকুরের পাড় ভেঙে ভবনও এখন ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে, যেকোনো সময় ভেঙে পড়ার শঙ্কা রয়েছে। সব মিলিয়ে জলাবদ্ধতার কারণে বিদ্যালয়টিতে শিক্ষার্থীর উপস্থিতির হার নেমে এসেছে মাত্র ৬০ শতাংশে।
উপজেলার ছোট কাবলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েরও একই চিত্র। মূল সড়ক থেকে বিদ্যালয়টির দূরত্ব প্রায় ৪০০ মিটার এবং মাটির সরু পথ দিয়েই যাতায়াত করতে হয়, যা বর্ষার পানিতে কাদা ও জলাবদ্ধতায় পরিণত হয়। উপজেলার মোট ৩৪টি বিদ্যালয়ে এমন পরিস্থিতি বিরাজমান বলে জানিয়েছেন এলাকাবাসী, যারা দ্রুত এসব সড়ক সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন।
চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী তানজিলা আক্তার ও পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী রবিউল ইসলাম জানায়, কাদাপানি মাড়িয়ে স্কুলে যাতায়াত করায় পচা পানির কারণে তাদের অনেকেরই পায়ে চুলকানি ও ঘা হয়েছে। ছোট শিক্ষার্থীরা প্রায়ই পানিতে পড়ে গিয়ে জামাকাপড় ও বই ভিজিয়ে ফেলে, যে কারণে অভিভাবকেরা তাদের স্কুলে পাঠাতে চান না।
স্থানীয় বাসিন্দা খাইরুল ইসলাম, নুর মোহাম্মদ ও আলতাফ হোসেনসহ কয়েকজন বলেন, ‘স্কুলপাড়ায় প্রায় দেড়শ পরিবারে পাঁচশ মানুষের বসবাস, অথচ এই পাড়ায় যাওয়ার পথ একটিই। পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা তৈরি হয় এবং বছরের প্রায় ছয়-সাত মাস এই পথ জলাবদ্ধ থাকে। পচা ও দুর্গন্ধযুক্ত পানির মধ্য দিয়ে আমাদের প্রতিনিয়ত চলাচল করতে হয়। এতে বাচ্চারা স্কুলে যাওয়া কমিয়ে দিয়েছে এবং পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়ছে। আমরা দ্রুত জলাবদ্ধতা নিরসন ও সড়ক সংস্কারের দাবি জানাই।’
গাবনা বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘আমাদের স্কুলের দুই পাশে (উত্তর ও দক্ষিণ) দুটি পুকুর থাকায় প্রতি বছর পাড় ভেঙে যাচ্ছে। এতে স্কুলের উত্তর পাশের ভবন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। গাইড ওয়াল নির্মাণ না হলে আগামী বছর হয়তো ভবনটি পুকুরে ধসে যাবে, যা পাঠদান কার্যক্রমকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করবে। জলাবদ্ধতা দূরীকরণসহ রাস্তা ও পাড় সংস্কার এখন খুবই জরুরি হয়ে পড়েছে।’
গাবনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সোহেল রানা বলেন, ‘বিদ্যালয়ে ৬ জন শিক্ষক ও ১৩২ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। বর্তমানে জলাবদ্ধতার কারণে মাত্র ৫০-৬০ শতাংশ শিক্ষার্থী স্কুলে আসছে। অভিভাবকেরা তাদের সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে চান না। আমরা শিক্ষকরাও এই পথ দিয়ে আসার সময় পোশাক নোংরা হয়ে যাওয়ায় বাধ্য হয়ে আলাদা পোশাক সঙ্গে নিয়ে আসি। প্রতি বছরই উপজেলা প্রশাসন ও শিক্ষা অফিসে আবেদন করেও কোনো কাজ হয়নি।’
বদলগাছী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মোঃ আমিরুল ইসলাম বলেন, ‘এই উপজেলায় ১৩৩টি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এর মধ্যে ৩৪টি বিদ্যালয়ের সংযোগ পথে বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতার কারণে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়। বিষয়টি নিয়ে উপজেলা প্রশাসনের সমন্বয় সভায় আলোচনা হয়েছে এবং স্থানীয় সংসদ সদস্য ফজলে হুদা বাবুলকেও অবগত করা হয়েছে।’
এ বিষয়ে বদলগাছী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইসরাত জাহান ছনি বলেন, ‘উপজেলার বেশ কিছু প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংযোগ সড়কে সমস্যা রয়েছে, যার কারণে শিক্ষার্থীদের যাতায়াতে ভোগান্তি পোহাতে হয়। আশা করছি, চলতি অর্থবছরেই সড়কগুলো সংস্কার করে চলাচল-উপযোগী করা হবে। এতে শিক্ষার্থীদের স্কুলে যাওয়ার আগ্রহও বাড়বে।’