সিলেটের পাঁচ উপজেলায় জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) পদযাত্রা কর্মসূচির ঘোষণায় টান টান উত্তেজনা বিরাজ করছে। উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে সমাবেশ ও পথযাত্রা ঘিরে সিলেটে পাঁচ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে।
সিলেটের জেলা প্রশাসক (ডিসি) আবদুল্লাহ আল মামুন বিজিবি মোতায়েন করতে বুধবার (২৯ জুলাই) আনুষ্ঠানিক চিঠি দেয়ার পর আধা-সামরিক বাহিনীর সদস্যদের মোতায়েন করা হয়। নয়া দিগন্তকে তথ্যটি নিশ্চিত করেছেন সিলেটের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) জাকির হোসাইন।
বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) ও শুক্রবার (৩১ জুলাই) সিলেটের ওসমানীনগর, জৈন্তাপুর, কানাইঘাট, গোয়াইনঘাট ও কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায় এই পদযাত্রা কর্মসূচির কথা জানিয়েছে এনসিপি।
এর মধ্যে বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টায় কানাইঘাট ও সন্ধ্যা ৭টায় ওসমানীনগরে পদযাত্রা ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। শুক্রবার বিকেল ৩টায় কোম্পানীগঞ্জ, বিকেল ৫টায় গোয়াইনঘাট ও সন্ধ্যা ৭টায় জৈন্তাপুরে পদযাত্রা শেষে সমাবেশ অনুষ্ঠানের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে এনসিপি।
পদযাত্রা ঘিরে ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সরগরম হয়ে উঠেছে। কর্মসূচিতে একটি পক্ষ বাধা দিতে পারে বলে অভিযোগ করেছেন এনসিপি নেতারা। সরকারের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিলে ছাত্রদলের কিছু নেতাকর্মী বিরোধিতা করে ব্যবস্থা নেয়ার বিষয়ে ফেসবুকে পোস্ট দিচ্ছেন বলে জানান এনসিপি নেতারা। তবে, এসব কর্মসূচিতে কঠোর অবস্থানে থাকবে বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
‘দেশ গড়তে জুলাই জাগরণ’ স্লোগানকে সামনে রেখে সারাদেশে পদযাত্রা কর্মসূচি পালন করছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। এরই ধারাবাহিকতায় বৃহস্পতিবার সিলেট জেলার কানাইঘাট উপজেলা ও ওসমানীনগর উপজেলায় পদযাত্রা শেষে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। এছাড়া গোলাপগঞ্জ উপজেলার পৌরসভা এলাকায় ও এতিমগঞ্জ বাজার এলাকায় বৃহস্পতিবার বেলা ১১টায় এনসিপির পথসভা করার কথা রয়েছে।
এনসিপি সূত্রে জানা গেছে, কর্মসূচিতে এনসিপির আহ্বায়ক ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম, সদস্য সচিব আখতার হোসেন, সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ডা: মাহমুদা মিতু, মুখ্য সংগঠক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সমন্বয়ক সারজিস আলম, দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ, মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াসহ কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ উপস্থিত থাকবেন।
এর আগে, মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) হবিগঞ্জে এনসিপির পদযাত্রায় সারজিস আলমসহ স্থানীয় নেতাদের ওপর হামলা ও বুধবার পুলিশ কর্তৃক এনসিপি নেতাদের হবিগঞ্জ শহরে ঢুকতে না দেয়ায় সিলেটের এসব কর্মসূচি ঘিরে উদ্বেগ, উত্তেজনা দেখা দিয়েছে।
ওসমানীনগর উপজেলা ছাত্রদলের সভাপতি জুয়েব আহমদ বলেন, ‘আমরা একটি আদর্শ নিয়ে রাজনীতি করি, কাউকে আঘাত করিনি। আমরা গঠনমূলক রাজনৈতিক আচরণে বিশ্বাস করি। তবে কেউ যদি হিংসাত্মক বা উসকানিমূলক বক্তব্য দেন এবং তাতে কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়, তাহলে তার দায় সংশ্লিষ্টদেরই নিতে হবে। আমরা আশা করি, এনসিপির নেতারাও দায়িত্বশীল বক্তব্য দেবেন এবং কর্মসূচি শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হবে।’
এ বিষয়ে ওসমানীনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গোলাম মোস্তফা বলেন, ‘ওসমানীনগরে এনসিপির কর্মসূচিতে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটবে বলে আমরা মনে করছি না। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক।’
এদিকে, কেন্দ্রীয় নেতাদের কানাইঘাট আগমন উপলক্ষে স্থানীয় সাংবাদিকদের সাথে প্রেস ব্রিফিং করেছেন এনসিপি কানাইঘাট উপজেলা শাখার নেতৃবৃন্দ।
ব্রিফিংয়ে এনসিপি সিলেট জেলা শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক হাফিজ বুরহান উদ্দিন ইউসুফ বলেন, ‘এনসিপির পদযাত্রা ঘিরে কানাইঘাটে ব্যাপক উৎসাহ সৃষ্টি হয়েছে। দলমত নির্বিশেষে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। আমরা আশাবাদী, সারাদেশে অনুষ্ঠিত এনসিপির কর্মসূচিগুলোর মধ্যে কানাইঘাটের আয়োজন হবে অন্যতম।’
তিনি বলেন, ‘কর্মসূচি সফল করতে উপজেলাজুড়ে ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। নেতাকর্মীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে কানাইঘাটে একটি বড় রাজনৈতিক সমাবেশে পরিণত হবে এ পদযাত্রা।’
কর্মসূচির বিষয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির কেন্দ্রীয় সদস্য ব্যারিস্টার জুনেদ আহমদ নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘সিলেট সব সময় সম্প্রীতি, সহমর্মিতা ও রাজনৈতিক সহাবস্থানের অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। জাতীয় নাগরিক পার্টির প্রতি সিলেটের মানুষের ব্যাপক জনসমর্থন রয়েছে। গত বছরের জুলাইয়ের পদযাত্রাতেও সেই জনসমর্থনের প্রতিফলন দেখা গেছে। ওসমানীনগর, কানাইঘাট, জৈন্তাপুর, কোম্পানীগঞ্জ ও গোয়াইনঘাটে আমাদের সাংগঠনিক কমিটিগুলো ধারাবাহিকভাবে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।’
তিনি বলেন, ‘কিন্তু হবিগঞ্জে যেভাবে হামলার ঘটনা ঘটেছে, সিলেটে যেন তার পুনরাবৃত্তি না হয়। সরকার পরিবর্তনের পর কেউ যদি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমনের চেষ্টা করে, তাহলে তা গণতন্ত্র, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর হবে।’
তিনি আরো বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি ডিআইজির সাথে একাধিকবার কথা বলেছি। প্রশাসনের কাছে আমাদের আহ্বান, বাংলাদেশের কোথাও যেন কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচিতে হবিগঞ্জের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে। বিশেষ করে সিলেটে এমন কিছু হলে, পরিস্থিতি আরো খারাপের দিকে যেতে পারে। তাই দুষ্কৃতকারীদের বিষয়ে প্রশাসনকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে। এনসিপি কখনো কাউকে উসকানি দেয়নি, কারো ওপর হামলা করেনি বা বলপ্রয়োগের রাজনীতিও করে না।’
অন্যান্য রাজনৈতিক দলের প্রতি আহ্বান জানিয়ে ব্যারিস্টার জুনেদ আহমদ বলেন, ‘গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষায় সবাই সোচ্চার হোন। হবিগঞ্জের মতো ঘটনার বিরুদ্ধে সবাইকে অবস্থান নিতে হবে। দেশের স্বার্থে কথা বলতে হবে। সিলেটের আমাদের সব কর্মসূচিতেই সব রাজনৈতিক দল ও সচেতন নাগরিককে আমন্ত্রণ জানাই।’
সিলেটের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) জাকির হোসাইন নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘সিলেটে এনসিপি নেতাদের ওসমানীনগর, কানাইঘাট, জৈন্তাপুর, গোয়াইনঘাট ও কোম্পানীগঞ্জ সফর উপলক্ষে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। নিরাপত্তায় সাদা পোশাকের পুলিশ, ডিবি, এপিবিএন, জেলা পুলিশ ও পাঁচ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে।’