কর্ণফুলী নদীর ওপারে একটি অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়তে ২০১৪ সালে বাংলাদেশ ও চীন একটি সমঝোতা স্মারক সই করেছিল। ২০১৬ সালে শুরু করে জমি অধিগ্রহণ। গত ১০ বছরে আর কোনো আলো পড়েনি এই প্রকল্পে। দীর্ঘ এ সময়ে বৈরাগ থেকে ইকোনমিক জোন পর্যন্ত চার লেনের এক কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে। প্রকল্প এলাকায় হয়েছে একটি অফিস। আর বৈরাগ অংশে হয়েছে প্রায় এক কিলোমিটারের সীমানাপ্রাচীর।
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের পর ব্যাপক গতি এসেছে এই প্রকল্পের কাজে। একই সময়ে অনুমোদন পেয়েছে টানেলসংলগ্ন চট্টগ্রাম-কক্সবাজার বিকল্প আরও দুটি সড়ক। এগুলো চালু হলে চট্টগ্রাম-কক্সবাজারের দূরত্ব প্রায় ৪০ কিলোমিটার কমবে এবং ভ্রমণের সময় কমে যাবে প্রায় এক ঘণ্টা। তখন নতুন গতি আসবে নদীর ওপারেও। টানেলেরও বাড়বে ব্যস্ততা। কমবে লোকসান, বাড়বে গাড়ির সংখ্যাও।
বেজার নির্বাহী সদস্য (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) মেজর জেনারেল (অব.) মো. নজরুল ইসলাম বলেন, এই অর্থনৈতিক অঞ্চলে উন্নত টেক্সটাইল, ওষুধ, হালকা প্রকৌশল, তথ্যপ্রযুক্তি ও অন্যান্য রপ্তানিমুখী শিল্পের মতো খাতে চীনা বিনিয়োগকারীরা আসবেন। যুক্ত হবেন দেশি ও অন্যান্য বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও। প্রকল্পটি ২০৩১ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে সম্পন্ন করার জন্য নির্ধারিত রয়েছে।
চায়না ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোনের প্রতিনিধি মোহাম্মদ শাহেদ বলেন, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) আজ সোমবার এই বিশেষায়িত অঞ্চলের মূল প্রকল্পের উদ্বোধন প্রস্তুতি সম্পন্ন করছে। জোনের প্রধান ফটকের কাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। কার্পেটিং করা হচ্ছে সড়কও। কর্তৃপক্ষ আশা করছে, এ প্রকল্প প্রায় ৫০ কোটি ডলার সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) আনবে এবং এক লাখেরও বেশি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে।
পরিকল্পনাবিদ, অর্থনীতিবিদ এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, চট্টগ্রামের আনোয়ারায় চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল ও চট্টগ্রাম-কক্সবাজারের মধ্যে বিকল্প মহাসড়ক নির্মাণের উদ্যোগ বাস্তবায়ন হলে কর্ণফুলী টানেলের যানবাহন চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। একই সঙ্গে চট্টগ্রামের দক্ষিণ তীরে শিল্পায়ন, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং নগরায়ণে নতুন গতি সৃষ্টি হবে। এর ফলে দীর্ঘদিন ধরে লোকসানে থাকা টানেলের আর্থিক অবস্থারও উন্নতি হতে পারে।
চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে সরকার-টু-সরকার (জিটুজি) উদ্যোগের আওতায় প্রায় ৮০০ একর জমির ওপর এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, প্রাথমিক পর্যায়েই প্রায় ৩০টি স্পিনিং মিলসহ বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি বস্ত্র, তৈরি পোশাকের কাঁচামাল, হালকা প্রকৌশল, রাসায়নিক, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম এবং রপ্তানিমুখী বিভিন্ন শিল্পেও বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করেছে একাধিক প্রতিষ্ঠান। প্রকল্পে কয়েক হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ এবং লক্ষাধিক মানুষের কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
কর্ণফুলী টানেলের পুরো সুফল পেতে এবং চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের বিকল্প হিসেবে দুটি বড় সড়ক প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এই প্রকল্পগুলো মূলত টানেলের আনোয়ারা প্রান্ত থেকে কক্সবাজারের সংযোগ সহজ ও দ্রুত করার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হচ্ছে। বিকল্প প্রকল্পগুলোর একটি হচ্ছে পিএবি-টইটং আঞ্চলিক মহাসড়ক উন্নয়ন প্রকল্প (প্রধান বিকল্প)। গত জুন মাসে একনেক সভায় প্রায় এক হাজার ১৮৩ কোটি টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এটির রুট আনোয়ারার কালাবিবির দিঘি থেকে শুরু হয়ে বাঁশখালী হয়ে কক্সবাজারের পেকুয়ার মাতামুহুরী পর্যন্ত। সড়কটির মোট দৈর্ঘ্য ৫৮.২ কিলোমিটার। বর্তমানের ১৮ ফুট প্রশস্ত সড়কটিকে ৩৪ ফুটে উন্নীত করা হবে। এই রুটটি ব্যবহার করলে চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজারের দূরত্ব প্রায় ৪০ কিলোমিটার কমে যাবে এবং ভ্রমণ সময় বাঁচবে প্রায় এক ঘণ্টা। এটি মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ তৈরি করবে। চার বছর মেয়াদি এই প্রকল্পটির কাজ ১ জুলাই ২০২৬ থেকে শুরু হয়ে ২০৩০ সালের জুনের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।
(গাছবাড়িয়া লিঙ্ক রোড) টানেল থেকে বের হয়ে মূল চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে দ্রুত যুক্ত হওয়ার জন্য আরেকটি প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে। এর প্রাক্কলিত ব্যয় ৪৬৩ কোটি টাকা। এটি আনোয়ারা কালাবিবির দিঘির মোড় থেকে শুরু হয়ে আনোয়ারা সদর, বরকল ব্রিজ ও চন্দনাইশ সদর হয়ে গাছবাড়িয়া কলেজ গেট এলাকায় মূল মহাসড়কের সঙ্গে যুক্ত হবে। এই সংযোগ সড়কটি ২১.১ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং ১০.৩ মিটার (৩৪ ফুট) প্রশস্ত হবে। এটি হলে কক্সবাজারগামী যানবাহনগুলোকে আর পটিয়ার শিকলবাহা ক্রসিং বা চাতরী জংশনের যানজটে পড়তে হবে না। এতে দূরত্ব ১৭ কিলোমিটার কমবে। সময় প্রায় ৩০ মিনিট কমবে। এটিও কর্ণফুলী টানেলের ব্যবহার বহু গুণ বাড়িয়ে দেবে।