যৌন নিপীড়নের অভিযোগ ওঠার প্রায় দুই বছর পর আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) চিফ প্রসিকিউটর করিম খানকে বরখাস্ত করেছেন সংস্থাটির সদস্য রাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা।
শুক্রবার (২৪ জুলাই) এক ভোটাভুটির মাধ্যমে সর্বসম্মতিক্রমে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সংস্থাটির ইতিহাসেও কোনো চিফ প্রসিকিউটরকে অপসারণের প্রথম ঘটনা এটি।
ব্রিটেনের এই জ্যেষ্ঠ আইনি বিশেষজ্ঞ ও সাবেক ব্যারিস্টার করিম খানের বিরুদ্ধে এক নারী সহকারীকে যৌন হয়রানি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ ওঠে। যদিও শুরু থেকেই এই অভিযোগ ভিত্তিহীন দাবি করে দৃঢ়ভাবে তা অস্বীকার করে আসছেন তিনি।
আদালতের অভ্যন্তরীণ তদারকি পর্ষদের এক প্রতিবেদনে করিম খানের বিরুদ্ধে ‘গুরুতর পেশাগত অসদাচরণ’-এর প্রমাণ পাওয়া যায়।
সংস্থাটির তৈরি নথির তথ্যানুযায়ী, করিম খান ওই নারী সহকর্মীর সঙ্গে জোরপূর্বক অনৈতিক সম্পর্কে লিপ্ত হন এবং পরবর্তীতে অভিযোগটি যেন আদালতে না ওঠে সে জন্য তাকে চাপ দেওয়ার চেষ্টা করেন। এর পর থেকেই গত জুনে তাকে সাময়িকভাবে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
শুক্রবার ভোটাভুটির শুরুতে সিয়েরা লিওন করিম খানকে বরখাস্ত করার প্রক্রিয়া কঠিন করার জন্য একটি প্রস্তাব উত্থাপন করে। তবে তিন কূটনীতিক জানান, অধিকাংশ দেশ প্রস্তাবটির বিপক্ষে ভোট দিলে তা ভেস্তে যায় এবং নির্ধারিত সময়ের কয়েক ঘণ্টা আগেই অপসারণ প্রক্রিয়ার মূল ভোট গ্রহণ সম্পন্ন হয়। ভোটে আইসিসির ১২৫টি সদস্য রাষ্ট্রের বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ করিম খানকে বরখাস্তের পক্ষে রায় দেন।
আরও পড়ুনআরও পড়ুনপ্রথমবারের মতো ইরানে হামলা চালিয়েছে বাহরাইন ও কুয়েত
এমন এক সময়ে এই নজিরবিহীন বরখাস্তের ঘটনা ঘটল, যখন ইসরাইল-গাজা যুদ্ধ ও আফগানিস্তান ইস্যুতে আইসিসি চরম মার্কিন রাজনৈতিক চাপের মুখোমুখি।
সম্প্রতি মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানান, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত যুক্তরাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রতি হুমকি তৈরি করছে এবং একে ‘নিষ্ক্রিয় ও ধসে দেওয়ার জন্য একটি বড় ধরনের প্রচার অভিযান’ শুরু করেছে মার্কিন প্রশাসন।
ট্রাম্প প্রশাসন ইতোপূর্বেই করিম খানসহ বেশ কয়েকজন আইসিসি কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল—বিশেষ করে গাজায় যুদ্ধাপরাধের দায়ে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির পর।
জাতিসংঘে নিযুক্ত ইসরাইলের রাষ্ট্রদূত ড্যানি ড্যানন এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘করিম খান ভেবেছিলেন ইসরাইলের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে বিশ্ববাসীর নজর সরিয়ে নেবেন এবং নিজের মারাত্মক যৌন নিপীড়নের অভিযোগ থেকে বেঁচে যাবেন। কিন্তু তার সেই ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়েছে।’
তবে বিশেষজ্ঞ ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, করিম খান পদচ্যুত হলেও তার সময়ে দেওয়া কোনো আন্তর্জাতিক গ্রেফতারি পরোয়ানার ওপর এর সরাসরি কোনো প্রভাব পড়বে না। ডাচ বিশ্ববিদ্যালয় উট্রেখটের গবেষক ইভা ভুকুসিচ জানান, ‘আইসিসির ইতিহাসে এই প্রথম একজন প্রসিকিউটর কোনো পশ্চিমা মিত্রদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। ফলে এই ঘটনার সঙ্গে ভূ-রাজনীতিও জড়িয়ে গিয়েছিল।’
আইসিসির বিধি অনুযায়ী, করিম খানের বরখাস্তের ফলে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে জারিকৃত গ্রেফতারি পরোয়ানা বাতিল বা স্থগিত হচ্ছে না। কেবল আদালতের বিচারক প্যানেলই এই পরোয়ানা প্রত্যাহার বা পরিবর্তন করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।