মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলায় মানসিক রোগাক্রান্ত দুই মেয়েকে নিয়ে বিপাকে পড়েছেন এক অসহায় ভিক্ষুক মা। না পারছেন চিকিৎসা করাতে, না পারছেন এদের দুই বেলা অন্নের সংস্থান করতে।
উপজেলার পশ্চিম জুড়ী ইউনিয়নের বাছিরপুর (চাক্কাটিলা) গ্রামের মৃত মরতুজ আলীর স্ত্রী জামিনা খাতুনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়- তার স্বামী দিনমজুর ছিলেন। তাদের সংসারে ৩ মেয়ে। প্রায় ২৫ বছর আগে স্বামী মারা যান। তিনি মানুষের বাড়ি কাজ করে ও ভিক্ষা করে সংসার চালান, মেয়েদের লালন-পালন করে বড় করেন। বড় মেয়ে আফিয়া খাতুনকে বিয়ে দিয়েছিলেন বড়লেখা উপজেলার দক্ষিণভাগ এলাকায়। বিয়ের বছর যেতেই তার মৃত সন্তান জন্ম হয়। এ নিয়ে তিনি দুশ্চিন্তায় ভোগতে শুরু করেন। কিছু দিনের মধ্যে তার মানসিক সমস্যা দেখা দেয়।
তখন স্বামী তার কোনো চিকিৎসা না করিয়ে তাকে মায়ের কাছে পাঠিয়ে দেন এবং পরে তালাক দেন। এতে করে আফিয়ার মানসিক সমস্যা বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে তা বড় আকার ধারণ করে। তিনি বাধ্য হয়ে মেয়েকে শিকলবন্দি করেন।
দ্বিতীয় মেয়ে রোবেনা বেগম ছিল সহজ-সরল। তাকে একই ইউনিয়নের পশ্চিম হরিরামপুর (মইজননগর) গ্রামে বিয়ে দেন। বছরান্তে তার সন্তান প্রসবের সময় হলে তাকে স্থানীয় একটি প্রাইভেট হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকের পরামর্শে সিজারিয়ান অপারেশনে তার মৃত সন্তান হয়। এ কথা শুনে স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজন তাকে হাসপাতাল রেখেই পালিয়ে যান। পরে মা ভিক্ষা করে ও জমি বিক্রি করে হাসপাতালের বিল পরিশোধ করে মেয়েকে বাড়ি নিয়ে যান। সেই থেকে রোবেনা মানসিক রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়েন। এর মধ্যে স্বামী তাকে তালাক দেন। মা বাধ্য হন তাকেও শিকলে বেঁধে রাখতে। কারণ একটু সুযোগ পেলেই তিনি দৌড়ে তার স্বামীর বাড়িতে চলে যান।
মেয়ে দুটিকে অর্থাভাবে উন্নত চিকিৎসা করানো হয়নি। সমাজসেবা অধিদপ্তর কর্তৃক প্রদত্ত প্রতিবন্ধী পরিচয়পত্র মতে, আফিয়া খাতুন মাঝারি ধরনের বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী এবং রোবেনা বেগম মাঝারি ধরনের দীর্ঘস্থায়ী মানসিক অসুস্থতাজনিত প্রতিবন্ধী।
সরেজমিন দেখা যায়, জামিনা খাতুনের মুলঘরের সঙ্গে একচালা একটি কক্ষে মাটির মধ্যে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে দুই বোন শিকলবন্দি অবস্থায় আছেন। মাঝে মধ্যে শিকল খুলে দিয়ে দরজা বাইরে থেকে বেঁধে রাখা হয়। যাতে তারা বের হয়ে যেতে না পারে। বৃদ্ধা মা যতটুকু সম্ভব মেয়েদের পরিচ্ছন্ন রাখার চেষ্টা করেন। তবে ইচ্ছা থাকলেও সব সময় সেটা সম্ভব হয় না। ভালো কোনো পোশাক তাদের পরানোর সামর্থ্য মায়ের নেই।
বৃদ্ধা জামিনা খাতুন বলেন, ভিক্ষা করে পেটের ভাত জোগাইতে কষ্ট হয়। চিকিৎসা কী দিয়ে করব? তাছাড়া ভালো ডাক্তার কই আছে আমি তো জানি না। আমি একা মানুষ এই পাগল মেয়েদের নিয়ে যাইতেও পারব না। চিকিৎসা করালে হয়তো আমার মেয়েগুলো ভালো হতো।
পশ্চিম জুড়ী ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম জানান, এই পরিবারটির অসহায়ত্বের শেষ নেই। জামিনা খাতুন বিধবা ভাতা পান। তার মেয়ে আফিয়া আগে থেকেই প্রতিবন্ধী ভাতা পায় এবং ছোট মেয়ে চলতি বছর থেকে প্রতিবন্ধী ভাতা পাচ্ছে। এছাড়া ঘর মেরামতের জন্য টিন ও আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। আমার ব্যক্তিগত পক্ষ থেকেও যথাসাধ্য সহযোগিতা দেওয়া হয়। মেয়েদের চিকিৎসার বিষয়ে কেউ উদ্যোগ নিলে আমরা পাশে থাকব।
জুড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সমরজিৎ সিংহ জানান, মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ দিয়ে চিকিৎসা করালে এ রকম রোগী ভালো থাকে। চিকিৎসা খুব বেশি ব্যয়বহুল না হলেও দীর্ঘ মেয়াদে ওষুধ সেবন করতে হয়। সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মানসিক ইউনিট রয়েছে। সেখানে গেলে ওরা ভালো চিকিৎসা পেতে পারেন।
অসুস্থ আফিয়া ও রোবেনার চিকিৎসার জন্য সহযোগিতার অনুরোধ জানিয়েছেন তাদের অসহায় মা।