চৌধুরী জোসেন:
বাংলাদেশের অর্থনীতি আজ এক ঐতিহাসিক মোড় ঘুরে দাঁড়িয়েছে। দৃশ্যমান অবকাঠামোগত উন্নয়ন, জিডিপি প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান কিংবা বৈদেশিক বাণিজ্যের আলো ঝলমলে চিত্রের অন্তরালে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে এক করুণ বাস্তবতা—দেশের যুব সমাজের অর্থনৈতিক ও সামাজিক রূপান্তর। দেশের কোটি কোটি তরুণ, যারা একটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি। তারা আজ এক বিশাল অনিশ্চয়তা ও অন্ধকারে নিপতিত। বিশেষ করে কর্মসংস্থানের সংকট, তীব্র বেতন-বৈষম্য এবং প্রাতিষ্ঠানিক অবমূল্যায়নের কারণে যুব সমাজ আজ রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক কাঠামোর প্রান্তসীমায় এসে পৌঁছেছে।
সম্প্রতি গার্মেন্টস শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ও অধিকার অর্জনের আন্দোলন যখন রাজপথে আলোড়ন তোলে, ঠিক তখনই আড়ালে থেকে যায় দেশের লাখ লাখ শিক্ষিত মধ্যবিত্ত যুবকের নীরব ক্রন্দন। করপোরেট হাউস, বেসরকারী প্রতিষ্ঠান, এনজিও, বিপণন (মার্কেটিং) খাত কিংবা বেসরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত এই যুবসমাজ আজ এক অদৃশ্য শোষণের শিকার। একদিকে আকাশছোঁয়া মূল্যস্ফীতি, অন্যদিকে চরম অপ্রতুল বেতন—এই দুইয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে যুব সমাজ তাদের ভবিষ্যৎ দিনদিন কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে শ্রমবাজারের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। প্রতি বছর দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে লাখ লাখ স্নাতক ডিগ্রিধারী বের হচ্ছেন, কিন্তু তাদের যোগ্যতানুযায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে না। অর্থনীতিতে শ্রমের অতিরিক্ত যোগান থাকায় নিয়োগকর্তারা এই পরিস্থিতির পূর্ণ সুযোগ নিচ্ছেন। আজকের দিনে একজন উচ্চশিক্ষিত তরুণকে ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা বেতনে চাকরিতে যোগ দিতে বাধ্য করা হচ্ছে। বর্তমান বাজারের বাস্তবতায় এই সামান্য অর্থ দিয়ে একজন মানুষের নিজের জীবনযাত্রার ন্যূনতম ব্যয় মেটানোই অসম্ভব, সেখানে পরিবারকে সহায়তা করার প্রশ্নটিই অবান্তর। চাকরির বাজারে বিকল্প কোনো সুযোগ না থাকায় শিক্ষিত তরুণরা জেনে-বুঝে এই শোষণ মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছেন।
দেশের আপামর জনগণের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ করের টাকায় সরকারি কোষাগার সমৃদ্ধ হয়। যা দিয়ে সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধি করা হয়। কিন্তু দুঃখজনক সত্য হলো, যাদের করের টাকায় এই বেতন বৃদ্ধি ঘটে, সেই বেসরকারি খাতের কর্মচারীদের আয়ের কোনো নিশ্চয়তা বা সামঞ্জস্যপূর্ণ বৃদ্ধি ঘটে না। সরকার যখন সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন পে-স্কেল বা ভাতা ঘোষণা করে, তখন বাজারে তার প্রভাবে মূল্যস্ফীতি বাড়ে। কিন্তু সেই বাড়তি খরচের চাপ বইতে হয় বেসরকারি খাতের নিম্ন আয়ের তরুণ কর্মচারীদের, যাদের বেতন থাকে অপরিবর্তিত। এটি কেবল অর্থনৈতিক বৈষম্য নয়, এটি একটি স্পষ্ট শোষণ।
উপযুক্ত কর্মসংস্থান ও জীবনধারণের উপযোগী বেতনের অভাবে তরুণ সমাজের ওপর সৃষ্টি হচ্ছে তীব্র মানসিক চাপ। শিক্ষিত মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানরা সামাজিক মর্যাদার ভয়ে অনেক নিম্নমানের কাজ যেমন করতে পারেন না, তেমনই সামান্য বেতনের চাকরি ছেড়ে দিয়ে বেকার থাকার সাহসও পান না। এই মনস্তাত্ত্বিক পঙ্গুত্ব তরুণদের ভেতর থেকে নিঃশেষ করে দিচ্ছে। দেশে নিজের শ্রমের সঠিক মূল্যায়ন না পেয়ে এবং ভবিষ্যৎ অন্ধকার দেখে মেধাবী তরুণদের বড় একটি অংশ দেশ ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে। যে মেধা দেশের অর্থনীতি ও সমাজকে সমৃদ্ধ করতে পারত, তা পাড়ি জমাচ্ছে উন্নত বিশ্বে।
কেন তারা সংগঠিত হতে পারছে না? এর উত্তরে বলা যায়, গার্মেন্টস বা কারখানা ভিত্তিক শিল্প খাতের শ্রমিকেরা ভৌগোলিকভাবে এক জায়গায় কাজ করার ফলে এবং ট্রেড ইউনিয়নের দীর্ঘ ইতিহাসের কারণে নিজেদের অধিকার আদায়ে সংগঠিত হতে পারেন। রাজপথে নেমে দাবি আদায় করার একটি সংস্কৃতি তাদের রয়েছে। কিন্তু শিক্ষিত বেসরকারি চাকুরিজীবীদের ক্ষেত্রে চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন।
মধ্যবিত্ত বা নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে আসা শিক্ষিত তরুণদের মনে একটি মিথ্যা সামাজিক মর্যাদার বোধ কাজ করে। "আমি অফিসে টাই-স্যুট পরে কাজ করি, আমি রাজপথে আন্দোলন করার শ্রমিক নই"—এই মানসিকতা তাদের একতাবদ্ধ হওয়ার পথে বড় বাধা। তাছাড়া, যেকোনো ধরনের প্রতিবাদ বা দাবি তোলার সাথে সাথে চাকরিচ্যুত করার হুমকি থাকে। যেহেতু পেছনে হাজার হাজার বেকার তরুণ একই কম বেতনে কাজ করতে প্রস্তুত, তাই একা কেউ মুখ খোলার সাহস পান না। এবং বেসরকারি করপোরেট, এনজিও বা শিক্ষা খাতে কোনো কার্যকর পেশাজীবী সংগঠন বা ইউনিয়ন নেই যা কর্মচারীদের ন্যূনতম অধিকার রক্ষার জন্য মালিকপক্ষের সাথে দরকষাকষি করতে পারে।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, কোনো অধিকারই বিনাশ্রমে বা উপহার হিসেবে অর্জিত হয় না। এককভাবে প্রতিবাদ করলে তা সহজেই দমন করা যায়, কিন্তু সংগঠিত শক্তিকে উপেক্ষা করার ক্ষমতা কোনো ব্যবস্থার থাকে না। বর্তমান বাস্তবতায় দেশের যুব সমাজকে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার খাতিরেই সংগঠিত হতে হবে। ক. তরুণরা যদি খাতভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম বা পেশাজীবী নেটওয়ার্কের মাধ্যমে একতাবদ্ধ হতে পারে, তবে নিয়োগকর্তারা এককভাবে কাউকে শোষণ বা অন্যায় ভাবে ছাঁটাই করার সাহস পাবে না। খ. সংগঠিত যুব সমাজ কেবল নিজেদের বেতনের দাবিই নয়, বরং কর্মক্ষেত্রের পরিবেশ, নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা, অতিরিক্ত কাজের ওভারটাইম এবং চিকিৎসার মতো মৌলিক অধিকারগুলো আদায়ে নীতিনির্ধারক ও মালিকপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারবে। গ. সংগঠিত হওয়ার মাধ্যমে তরুণরা বুঝতে পারবে যে তারা এই লড়াইয়ে একা নয়। এটি তাদের ভেতরের হীনমন্যতা ও হতাশা দূর করে একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের সাহস জোগাবে।
সংকট উত্তরণে করণীয় ও সুপারিশ
বাংলাদেশের যুব সমাজকে এই অন্ধকার থেকে বের করে আনতে হলে রাষ্ট্র, সমাজ এবং তরুণদের নিজেদের জায়গা থেকে যৌথ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে:
১. সরকার নির্ধারিত ন্যূনতম মজুরি ব্যবস্থা কেবল শিল্প শ্রমিকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে, বেসরকারি সকল খাত (এনজিও, করপোরেট, প্রাইভেট স্কুল, আইটি, বিপণন) এর জন্য ‘জাতীয় ন্যূনতম মজুরি’ আইন সংশোধন ও কঠোর বাস্তবায়ন করতে হবে।
২. সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধির সাথে সামঞ্জস্য রেখে বাধ্যতামূলকভাবে বেসরকারি খাতের সর্বনিম্ন বেতন কাঠামো পুনর্বিন্যাসের আইনি বাধ্যবাধকতা তৈরি করতে হবে।
৩. শ্রম মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি বিশেষ তদারকি সেল গঠন করা উচিত, যারা বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে তরুণেরা শোষণমূলক বেতনে কাজ করছে কিনা এবং শ্রম আইন মানা হচ্ছে কিনা তা নিয়মিত অডিট করবে।
৪. প্রথাগত ট্রেড ইউনিয়নের বাইরে এসে তরুণদের জন্য আধুনিক, ডিজিটাল ও খাতভিত্তিক ‘প্রফেশনাল অ্যাসোসিয়েশন’ বা পেশাজীবী অধিকার প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলতে হবে, যেখানে পরিচয় গোপন রেখেও অধিকারের পক্ষে কণ্ঠ মেলানো সম্ভব।
৫. তরুণদের কেবল গতানুগতিক চাকরির পেছনে না ছুটিয়ে প্রযুক্তিভিত্তিক দক্ষতা, ব্যবহারিক জ্ঞান এবং সহজ শর্তে ঋণ দিয়ে নতুন উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ বাড়াতে হবে, যেন শ্রমবাজারে অতিরিক্ত চাপের সুযোগ নিয়োগকর্তারা নিতে না পারে।
যে রাষ্ট্র তার যুব সমাজকে সঠিক মর্যাদা, উপযুক্ত কর্মসংস্থান এবং বাঁচার মতো বেতন দিতে পারে না, সেই রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদী স্থায়িত্ব ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি তাসের ঘরের মতো ভঙ্গুর। তরুণদের কর্মসংস্থানহীনতা ও অবমূল্যায়ন কেবল ব্যক্তি বা পরিবারের সংকট নয়, এটি একটি সামগ্রিক জাতীয় নিরাপত্তা ও অস্তিত্বের হুমকি। সরকারি খাতের কর্মকর্তাদের জন্য কোষাগার উন্মুক্ত আর বেসরকারি খাতের লাখ লাখ শিক্ষিত যুবকের জন্য অনিশ্চিত অন্ধকার—এই নীতি কোনো টেকসই সমাজের পরিচয় হতে পারে না। তরুণ সমাজকে বুঝতে হবে, নীরবতা তাদের শোষণকে আরও দীর্ঘায়িত করবে। অতএব, নিজেদের শ্রেণীগত দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে, আধুনিক ও সুসংগঠিত উপায়ে নিজেদের ন্যায্য অধিকার, সম্মানজনক জীবন ও উপযুক্ত মজুরির দাবিতে সোচ্চার হওয়াই আজ ২০২৬ সালের বাংলাদেশের যুব সমাজের সামনে একমাত্র বিকল্প পথ।
চৌধুরী জোসেন
প্রেসিডিয়াম মেম্বার
বাংলাদেশ যুব ইউনিয়ন।