রাত হলেই নলবিলা রিজার্ভ ফরেস্ট থেকে লোকালয়ে হাতি, দুশ্চিন্তায় কৃষকেরা
ফরহাদ আহমদ, লামা, বান্দরবান:
লামা-আলীকদম প্রতিনিধি: বান্দরবানের লামা উপজেলার ফাইতং ইউনিয়নের কুইজ্জাখোলা এলাকায় বন্য হাতির পাল নেমে এসে প্রায় ২০০ শতক জমির ধান নষ্ট ও খেয়ে ফেলেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় কৃষকেরা। তাঁদের অভিযোগ, রাতের অন্ধকার নামার পর পাশের চকরিয়া উপজেলার নলবিলা রিজার্ভ ফরেস্ট থেকে হাতির পাল লোকালয়ে নেমে এসে কৃষিজমিতে ঢুকে পড়ছে। এতে পাকা ধান ঘরে তোলার আগেই ক্ষতির মুখে পড়েছেন কৃষকেরা।
স্থানীয় কৃষকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কৃষক মো. তারেকের প্রায় ২০ শতক, ফারুক শিকদারের ১০ শতক এবং হালিম শিকদারের প্রায় ২০ শতক জমির ধান হাতির পাল নষ্ট করেছে। এ ছাড়া আশপাশের আরও কয়েকজন কৃষকের জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সব মিলিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত জমির পরিমাণ প্রায় ২০০ শতক বলে দাবি স্থানীয় কৃষকদের।
কৃষকেরা জানান, ধান আবাদে তাঁদের দীর্ঘ সময়ের শ্রম ও অর্থ ব্যয় হয়েছে। ধান পাকার সময়ে হাতির আক্রমণে ফসলের ক্ষতি হওয়ায় উৎপাদন খরচের অর্থ ফেরত পাওয়া নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
কৃষক মো. তারেক বলেন, ‘আমার প্রায় ২০ শতক জমির ধান হাতির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ধান কাটার সময় ঘনিয়ে এসেছিল। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে।’
কৃষক ফারুক শিকদার বলেন, ‘আমার প্রায় ১০ শতক জমির ধান নষ্ট হয়েছে। ফসলের ক্ষতি হলে কৃষকের জন্য তা সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। আমরা চাই, ক্ষয়ক্ষতি যাচাই করে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তার ব্যবস্থা করা হোক।’
কৃষক হালিম শিকদার বলেন, ‘আমার প্রায় ২০ শতক জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ধান আবাদে যে অর্থ ও শ্রম ব্যয় হয়েছে, ফসল নষ্ট হলে সেই ক্ষতি পূরণ করা কঠিন। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে এনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।’
এবিষয়ে ফাইতং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. ওমর ফারুক বলেন, ‘কুইজ্জাখোলা এলাকায় বন্য হাতির কারণে কৃষকদের ধান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয়টি আমরা জানতে পেরেছি। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি সরেজমিনে যাচাই করা প্রয়োজন। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও বন বিভাগের নজরে এনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে। সরকারি বিধি অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ বা সহায়তার সুযোগ থাকলে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকেরা যাতে তা পান, সে বিষয়েও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘মানুষ ও বন্য হাতির সংঘাত কোনো পক্ষের জন্যই কাম্য নয়। কৃষকের ফসল ও মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি হাতির নিরাপদ চলাচলও বিবেচনায় রাখতে হবে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।’
স্থানীয়দের ভাষ্য, সন্ধ্যার পর হাতির পাল লোকালয়ের দিকে আসায় কৃষকদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়। কেউ কেউ নিজেদের ফসল রক্ষায় ক্ষেতের আশপাশে অবস্থান নেন। তবে হাতির কাছাকাছি গিয়ে তাড়ানোর চেষ্টা করলে মানুষের নিরাপত্তার পাশাপাশি বন্য হাতিরও ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে স্থানীয়রা সংঘাত এড়িয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর হস্তক্ষেপ চান।
কৃষকদের মতে, বন্য হাতি মানুষের শত্রু নয়, কৃষকেরাও হাতির শত্রু নন। বনাঞ্চল ও কৃষিজমির কাছাকাছি এলাকায় মানুষ ও হাতির চলাচলের কারণে তৈরি হওয়া এই সংঘাতের স্থায়ী সমাধান প্রয়োজন। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের আর্থিক ক্ষতি বিবেচনায় নিয়ে সরকারি সহায়তা দেওয়াও জরুরি।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকেরা কুইজ্জাখোলা এলাকায় সরেজমিনে পরিদর্শন করে হাতির আক্রমণে ক্ষতিগ্রস্ত জমির পরিমাণ ও ফসলের ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি সরকারি বিধি অনুযায়ী ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ন্যায্য ক্ষতিপূরণ বা আর্থিক সহায়তা দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।
একই সঙ্গে নলবিলা রিজার্ভ ফরেস্ট থেকে লোকালয়ে হাতির চলাচলের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে বন বিভাগ, স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
কৃষকদের প্রত্যাশা, দ্রুত সরেজমিনে ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করে তাঁদের পাশে দাঁড়াবে প্রশাসন এবং ফসল হারানো কৃষকেরা প্রচলিত সরকারি সহায়তার আওতায় আসবেন।