এইচ.কে রফিক উদ্দিন:
দীর্ঘদিন ঝুলে থাকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৩২ হাজারেরও বেশি প্রধান শিক্ষকের শূন্যপদ পূরণে বড় ধরনের অগ্রগতি শুরু হয়েছে। জাতীয়করণকৃত শিক্ষকদের জ্যেষ্ঠতা নিয়ে দীর্ঘদিনের আইনি জটিলতা নিরসনের পর অনলাইন ‘গ্রেডেশন তালিকা’ চূড়ান্ত করার কাজ করছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর (ডিপিই)। তবে জাতীয় পর্যায়ের এই প্রক্রিয়ার মধ্যেই কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলায় জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ ও পদোন্নতি নিয়ে কিছু শিক্ষকের মধ্যে উদ্বেগ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
২০১৩ সালে বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণের পর শিক্ষকদের জ্যেষ্ঠতা ও পদোন্নতি নিয়ে বিভিন্ন সময়ে জটিলতা তৈরি হয়। সম্প্রতি উচ্চ আদালতে এ-সংক্রান্ত আইনি প্রক্রিয়ার অগ্রগতির পর পদোন্নতির পথ আরও পরিষ্কার হয়েছে।
নতুন সংশোধিত নিয়োগবিধি অনুযায়ী, অভিজ্ঞতাসম্পন্ন সহকারী শিক্ষকদের মধ্য থেকে পদোন্নতির মাধ্যমে প্রধান শিক্ষকের ৮০% পদ (বাকি ২০% সরাসরি নিয়োগ) পূরণ করা হবে। অনলাইন তালিকা চূড়ান্তের পর ৩০ কর্মদিবস আপত্তি নিষ্পত্তির সময় দিয়ে আগামী তিন মাসের মধ্যে সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) অনুমোদন নিয়ে পদোন্নতি দৃশ্যমান করা হবে বলে জানান ডিপিই-এর পরিচালক মীর আব্দুল আউয়াল আল মেহেদী।
তবে উখিয়া উপজেলায় জ্যেষ্ঠতা তালিকা প্রণয়নকে কেন্দ্র করে কয়েকজন শিক্ষক বিভিন্ন ধরনের অনিয়মের আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তাদের অভিযোগ, অতীতে কিছু শিক্ষকের চাকরিতে যোগদানের তারিখ, প্রকল্পভিত্তিক নিয়োগ ও রাজস্ব খাতে অন্তর্ভুক্তির তথ্য নিয়ে যে জটিলতা তৈরি হয়েছিল, তা সঠিকভাবে যাচাই না করা হলে জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণে অসঙ্গতি দেখা দিতে পারে।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, ২০০১ ও ২০০৩ সালে এডিবি’র উন্নয়ন প্রকল্পে নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের ২০০৬ ও ২০০৭ সালে রাজস্ব খাতে স্থানান্তর করা হয়। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী রাজস্বকরণের দিন থেকেই জ্যেষ্ঠতা গণনা করার স্পষ্ট বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু তৎকালীন কয়েকজন অসাধু শিক্ষা কর্মকর্তার সহায়তায় উন্নয়ন প্রকল্পের তথ্য গোপন ও মোটা অঙ্কের ঘুষের বিনিময়ে বহু জুনিয়র শিক্ষককে বেআইনিভাবে ‘চলতি দায়িত্ব’ পাইয়ে দেওয়া হয়েছিল। বর্তমান পদোন্নতি পর্বেও সেই বিতর্কিত ও ভুয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই গোপনে খসড়া চূড়ান্ত করার চেষ্টা চলছে পারে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে উখিয়ার কয়েকজন শিক্ষক বলেন, তারা দীর্ঘদিন ধরে চাকরি করলেও অতীতে দায়িত্ব বণ্টন ও জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণে কিছু অসঙ্গতির কারণে তারা প্রত্যাশিত সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন বলে মনে করেন। বর্তমান গ্রেডেশন তালিকা তৈরির সময় পুরোনো নথি ও চাকরির তথ্য যথাযথভাবে যাচাই করে প্রকৃত জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ করা হলে বিষয়টির সুষ্ঠু সমাধান হবে বলে তারা আশা করছেন।
শিক্ষকদের দাবি, গ্রেডেশন তালিকা প্রণয়নের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের নিয়োগের তারিখ, রাজস্ব খাতে অন্তর্ভুক্তির তথ্য, চাকরির ধারাবাহিকতা এবং প্রযোজ্য সরকারি বিধিমালা যথাযথভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে খসড়া তালিকা প্রকাশ করে নিয়ম অনুযায়ী আপত্তি ও সংশোধনের সুযোগ রাখারও দাবি জানিয়েছেন তারা।
শিক্ষকদের একাংশ আরও বলেন, অতীতে যেসব ফাইল বা তথ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল, সেগুলো পুনরায় যাচাই করা হলে জ্যেষ্ঠতা নিয়ে বিদ্যমান বিভ্রান্তি দূর হতে পারে। কোনো শিক্ষক যেন নিয়মবহির্ভূতভাবে সুবিধা না পান এবং প্রকৃত জ্যেষ্ঠরা যেন তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত না হন—এ বিষয়টি নিশ্চিত করার দাবি তাদের।
বর্তমানে উখিয়া উপজেলায় মোট ৭৮টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এর মধ্যে ৬১টিতে প্রধান শিক্ষক কর্মরত থাকলেও ১৭টি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। এছাড়া ৪৮৭টি অনুমোদিত সহকারী শিক্ষকের পদের বিপরীতে বর্তমানে ৪২৯ জন শিক্ষক কর্মরত আছেন এবং ৫৮টি পদ শূন্য রয়েছে।
২০১৮ ও ২০১৯ সালে উখিয়ায় ৩০ জন সহকারী শিক্ষককে প্রধান শিক্ষকের ‘চলতি দায়িত্ব’ দেওয়া হয়েছিল। বর্তমানে তাদের মধ্যে ২৬ জন কর্মরত আছেন। তবে ওই সময় দায়িত্ব বণ্টনের ক্ষেত্রে জ্যেষ্ঠতা ও বিধিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তা নিয়েও কয়েকজন শিক্ষক প্রশ্ন তুলেছেন। বিষয়টি যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
বঞ্চিত শিক্ষকরা কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে জানান, অবিলম্বে বিগত সময়ের বিতর্কিত ফাইল ও তথ্য নতুন করে পুনঃতদন্ত করতে হবে এবং প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ করে খসড়া তালিকা জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে। অন্যথায় উখিয়ার প্রাথমিক শিক্ষার পরিবেশ রক্ষা ও জ্যেষ্ঠ শিক্ষকদের অধিকার আদায়ে পদোন্নতি কার্যক্রম স্থগিতাংশের দাবিতে উচ্চ আদালতের শরণাপন্ন হওয়ার আলটিমেটাম দিয়েছেন তারা।
জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন ও অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে উখিয়া উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ আশরাফুল আলম সিরাজী বলেন, গ্রেডেশন সংক্রান্ত নোটিশ জারি করা হয়েছে। সরকারি নিয়ম-কানুন ও বিধি অনুসরণ করেই শিক্ষকদের জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে তালিকা প্রস্তুত করা হবে। কোনো ধরনের অনিয়ম বা জালিয়াতির সুযোগ দেওয়া হবে না বলেও জানান তিনি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘদিনের জটিলতা নিরসনে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষভাবে গ্রেডেশন তালিকা প্রস্তুত করা গেলে শিক্ষকদের মধ্যে বিদ্যমান অসন্তোষ অনেকটাই কমে আসতে পারে। পাশাপাশি শূন্য পদে দ্রুত প্রধান শিক্ষক নিয়োগ হলে উখিয়ার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে প্রশাসনিক কার্যক্রম ও শিক্ষার পরিবেশ আরও কার্যকর হবে বলে আশা করছেন তারা।