একজন করোনা আক্রান্তের হৃদয় বিদারক গল্প

0
344

সিএনবি,ডেস্কঃ
এই এক অন্য জীবন… (এম. ‌এ আজিজ ) ফুলবাড়ি, শেরপুর, বগুড়া )

করোনায় আক্রান্ত হ‌ওয়ার আজ ১১তম দিন চলছে আমার। এই দিনগুলো জীবনের অন্য দিন গুলোর থেকে একদম আলাদা। একটা বন্ধ ঘরের মেঝেতে ছোট্ট করে পাতা একটা বিছানায় যেন এখন আমার পুরো পৃথিবী। নিয়ম করে কত রকমের গরম পানির গারগল আর ভাপ নেওয়ায় এখন আমার সারাদিনের কাজ। এই ঘরটা ছাড়া এই দুনিয়ার আর কোন কিছুতে যেন আমার একটুও অধিকার নেই। অনেকদিন আগে একবার অসুখে পড়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলাম। আত্মীয়-স্বজন বন্ধু-বান্ধবের জ্বালায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। এই তো সেদিন‌ও যখন আমি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লাম, তখনো চারদিকে কত মানুষ আমায় দেখতে এসেছিল। কিন্তু যখন‌ই সেই অসুস্থতার একটা নামকরণ হয়ে গেল, ধীরে ধীরে সবাই কেমন জানি দূরে সরতে লাগল। কি কুৎসিত, কি বীভৎস, কি ঘৃণিত একটা নাম “করোনা”। যেই শুনে সেই আঁতকে উঠে, পালিয়ে বাঁচে। খুব কাছের মানুষগুলোও কেমন জানি এই এগার দিনে অনেক দূরে সরে গেছে।সেদিনের সেই দৃশ্যটা চোখে ভাসছে, অসুস্থ হয়ে যখন অফিস থেকে চলে আসছিলাম, তখন সবাই যেন আমাকে শেষ বিদায় জানাচ্ছিল, আমার টেবিলটার দিকে তাকিয়ে চোখ জোড়া কেমন যেন ভিজে গিয়েছিল। সবাই বিদায় দিলেও ঐ টেবিলটা যেন আমায় ছাড়তে চাইছিল না। নাকি আমিই টেবিলটা ছাড়তে পারছিলাম না জানিনা। খুব প্রিয় আমার ঐ টেবিলটা।  চাকরির সুবাদে বাইরে থাকতে হয়। সপ্তাহ শেষে বাড়ি ফিরি। বৃহস্পতিবার হলেই সকাল থেকে যারা “কখন আসবি কখন আসবি” বলে মাথা খারাপ করে দিত, আজ এতদিন হয়ে গেল আমি ঘরবন্দী। কোথায় তারা? সপ্তাহে একটা দিন বাড়িতে থাকতাম। সেই একটা দিন যেন নিঃশ্বাস ফেলার সময় থাকত না আমার। সবাই কত কিছু আমার জন্য রাখতো আমি আসলে হবে বলে, কত জায়গায় কত প্রোগ্রাম, আমি ছাড়া নাকি চলবেই না তাদের। কোথায়? আর তো কেউ ডাকে না আমায়? বরং সকলের ভয়ের কারণ এখন আমি। একবার জানালা দিয়ে একটু আমের খোসা ফেলেছিলাম বলে পাশের বাড়ির এক আত্মীয় অভিযোগ করে গেছে “এটা যেন আর না করি”। অথচ কয় দিন আগেও সে বলছিল, “সেদিন রাতে যদি আমি না থাকতাম তাহলে নাকি তার স্বামীকে বাঁচাতে পারত না”। সেই মুখে আজ এই কথা খুব অবাক করার মত তাইনা? কিন্তু আমি অবাক হয়েছি কি না জানিনা। লোক মুখে ছড়াচ্ছে আমার আক্রান্ত হ‌ওয়ার খবর। আমি কখনো গোপন করার চেষ্টা করিনি। কি লাভ সত্যিটা চেপে রেখে? অনেকে খবরটা পেয়ে ফোন করে, হয়তো বিশ্বাস করতে পারছে না, নয়তো নিশ্চিত হতে পারছে না। শুনে, নিশ্চিত হয়, শান্তনা দেয়, ফোন রেখে চলে যায়। আমি যাই না, আমি থাকি, একা, কখনো আলোয়, কখনো অন্ধকারে, এই বদ্ধ ঘরে, আমার শত্রু করোনা। অনেকে শান্তনা দেয়, “চিন্তা করবে না সব ঠিক হয়ে যাবে।” সমবেদনার ভাষা গুলো বুঝি এমন‌ই হয়।কারো আপনজন মারা গেলে আমরা তাকে শান্তনা দিয়ে বলি, “এভাবে সবাইকেই একদিন চলে যেতে হবে দুঃখ করো না ইত্যাদি ইত্যাদি।” কিন্তু যার চলে যায় সেই বুঝে হারানোর কি ব্যাথা। তাই এইসব শান্তনা শুনে এখন হাসি পায় আমার। কিন্তু হাসবো কি করে? হাসতে মনে  হয় ভুলেই গিয়েছি। গতকাল থেকে করোনা আমার স্বাদ ও গন্ধের অনুভূতি টুকুও কেড়ে নিয়েছে। জানিনা আমার সাথে আরো কি কি করবে। হয়তো পায়ে হেঁটে আর আমাকে বেরোতেই দিবে না এই ঘর থেকে। তবে এই দিন গুলো অনেক কিছু শিখিয়ে যাচ্ছে। এ যেন এক অন্য জীবন।

article bottom

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here