১০০ জনের সম্পদের তথ্য চেয়েছে দুদক

0
98

সিএনবি ডেস্ক: অবৈধ সম্পদ অর্জনের সঙ্গে জড়িত সন্দেহে অন্তত ১০০ জনের সম্পদ ও ব্যাংক হিসাবের তথ্য চেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এই ১০০ জনের মধ্যে সরকার–দলীয় চার সাংসদসহ অধিকাংশই রাজনীতিক। ইতিমধ্যে এনবিআর এঁদের সম্পদ ও ব্যাংক হিসাব তলব করেছে। গতকাল সোমবার বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাছে তথ্য চেয়ে চিঠি দিয়েছে দুদক।

গত ১৮ সেপ্টেম্বর ‘শুদ্ধি’ অভিযান শুরুর পর দুদক প্রথমে ৪৩ জনের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরুর কথা জানালেও এই তালিকা দিন দিন বড় হচ্ছে। এ পর্যন্ত ২৩ জনের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হলেও আরও নিষেধাজ্ঞা আসছে বলে দুদক সূত্র বলছে। এ ছাড়া অভিযুক্তদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার প্রক্রিয়াও শুরু করেছে দুদক।

গত মাসে অভিযান শুরুর প্রথম দিনই রাজধানীর ইয়ংমেনস ফকিরাপুল ক্লাব থেকে গ্রেপ্তার হন ঢাকা মহানগর যুবলীগ দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক (পরে বহিষ্কৃত) খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া। এরপর বিভিন্ন অভিযানে একে একে গ্রেপ্তার হন কথিত যুবলীগ নেতা ও ঠিকাদার গোলাম কিবরিয়া শামীম ওরফে জি কে শামীম, মোহামেডান ক্লাবের ডাইরেক্টর ইনচার্জ লোকমান হোসেন ভূঁইয়া, ঢাকা মহানগর যুবলীগ দক্ষিণের সভাপতি (বহিষ্কৃত) ইসমাইল হোসেন চৌধুরী ওরফে সম্রাট, তাঁর সহযোগী এনামুল হক ওরফে আরমান, কলাবাগান ক্রীড়া চক্রের সভাপতি শফিকুল আলম ওরফে ফিরোজ, অনলাইন ক্যাসিনোর হোতা সেলিম প্রধান এবং ওয়ার্ড কাউন্সিলর হাবিবুর রহমান ও তারেকুজ্জামান রাজীব।

সম্পদ ও ব্যাংক হিসাব তলব
আরও যাঁদের সম্পদ ও ব্যাংক হিসাব তলব করা হয়েছে, তাঁরা হলেন স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি মোল্লা আবু কাওছার, স্ত্রী পারভীন লুনা, মেয়ে নুজহাত নাদিয়া নীলা এবং তাঁদের প্রতিষ্ঠান ফাইন পাওয়ার সল্যুশন লিমিটেড; যুবলীগের সদ্য বিদায়ী চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী, তাঁর স্ত্রী শেখ সুলতানা রেখা, ছেলে আবিদ চৌধুরী, মুক্তাদির আহমেদ চৌধুরী ও ইশতিয়াক আহমেদ চৌধুরী এবং তাঁদের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান লেক ভিউ প্রোপার্টিজ ও রাও কনস্ট্রাকশন; যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য শেখ ফজলুর রহমান মারুফ, তাঁর স্ত্রী সানজিদা রহমান, তাঁদের দুটি প্রতিষ্ঠান টি-টোয়েন্টিফোর গেমিং কোম্পানি লিমিটেড ও টি-টোয়েন্টিফোর ল ফার্ম লিমিটেডের ব্যাংক হিসাব; স্বেচ্ছাসেবক লীগের অর্থ সম্পাদক কে এম মাসুদুর রহমান, তাঁর স্ত্রী লুতফুর নাহার লুনা, বাবা আবুল খায়ের খান, মা রাজিয়া খান এবং তাঁদের প্রতিষ্ঠান সেবা গ্রিন লাইন লিমিটেড; যুবলীগ নেতা মুরসালিক আহমেদ, তাঁর বাবা আবদুল লতিফ, মা আছিয়া বেগম, স্ত্রী কাওসারী আজাদ প্রমুখ।

সরকারি কর্মকর্তাদের সংশ্লিষ্টতা
গণপূর্ত অধিদপ্তরের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম ও অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আবদুল হাইয়ের বিরুদ্ধে এরই মধ্যে অনুসন্ধান শুরু করেছে দুদক। তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ জি কে শামীমের সঙ্গে যোগসাজশের। তাঁদের ঘুষ দিয়ে শামীম গণপূর্তের বড় কাজগুলো বাগিয়ে নিয়েছেন। এ কাজে অন্তত আরও ১২ জনের সংশ্লিষ্টতার তথ্য দুদক পেয়েছে। সাবেক প্রধান প্রকৌশলী হাফিজুর রহমান মুন্সী, বর্তমান অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী উৎপল কুমার দে, নির্বাহী প্রকৌশলী ফজলুল হক, শওকত উল্লাহ, প্রকৌশলী স্বপন চাকমা, রোকন উদ্দিন, আবদুল কাদের চৌধুরী, আফসার উদ্দিন, আবদুল মোমেন চৌধুরী, ইলিয়াস আহমেদ এবং গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সহকারী প্রধান (পরিকল্পনা শাখা) মুমিতুর রহমান ও মন্ত্রণালয়ের সাজ্জাদ নামের একজনের নামও দুদকের তালিকায় এসেছে।

তাঁদের মধ্যে রফিকুল ইসলাম ও হাফিজুর রহমান মুন্সীর হিসাব তলব করেছে এনবিআর। হাফিজুরের স্ত্রী মারুফা রহমান কান্তা ও রফিকুলের স্ত্রী রাশেদা ইসলামের ব্যাংক হিসাব তলব করেছে এনবিআর। সাবেক অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আবদুল হাই ও তাঁর স্ত্রী বনানী সুলতানার ব্যাংক হিসাবও তলব করেছে এনবিআর। 

আরও অনুসন্ধান

যুবলীগের অব্যাহতি পাওয়া দপ্তর সম্পাদক কাজী আনিসুর রহমান ও তাঁর স্ত্রী সুমি রহমান, ওয়ার্ড কাউন্সিলর এ কে এম মমিনুল হক ওরফে সাঈদ, এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রশান্ত কুমার হালদার ও নুরুন্নবী চৌধুরী ওরফে শাওন ও তাঁর স্ত্রী ফারজানা চৌধুরী, লোকমান হোসেন ভূঁইয়ার স্ত্রী নাবিলা লোকমানের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। লোকমানের বিরুদ্ধে গত রোববার মামলা করেছে দুদক।

এ ছাড়া জি কে শামীমের পরিবারের সব সদস্যসহ তাঁর সহযোগী অন্তত ১০ জনের ব্যাংক হিসাব তলব করা হয়েছে। দুদক সূত্র জানিয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে তথ্য পাওয়ার পর যাচাই–বাছাই করে অনুসন্ধানে নামবে দুদক। দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ রোববার সাংবাদিকদের বলেন, অনিয়মের অভিযোগের প্রমাণ পেলে সবার বিরুদ্ধে মামলা হবে।

এ বছরের শুরুতে দুর্নীতির অনুসন্ধান চলাকালে অবৈধভাবে অর্জিত সম্পদ জব্দের সিদ্ধান্ত নেয় দুদক। এ সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মেডিকেল এডুকেশন শাখার হিসাবরক্ষক আবজাল হোসেন ও তাঁর স্ত্রী রুবিনা খাতুনের দুর্নীতির অনুসন্ধান পর্যায়েই সম্পদ জব্দ করা হয়।

বিদেশে যেতে মানা
২৩ অক্টোবর ২২ জনের এবং পরদিন আরেকজনের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা জারি করে দুদক। তাঁদের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিংসহ বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগের ব্যাপারে অনুসন্ধান করছে দুদক। এই ২৩ জনের তালিকায় আছেন তিন সাংসদ নুরুন্নবী চৌধুরী, সামশুল হক চৌধুরী ও মোয়াজ্জেম হোসেন। এ সপ্তাহে আরও অন্তত ২৫ জনের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হতে পারে।

সার্বিক বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, ‘অবৈধ সম্পদ অর্জনের বিষয়টি দুদকের তফসিলভুক্ত অপরাধ। সাম্প্রতিক শুদ্ধি অভিযান যেহেতু সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে নির্দেশনার মাধ্যমে হচ্ছে, তাই আমাদের আশা দুদক চাপমুক্তভাবে কাজ করতে পারবে।’

এত বড় কার্যক্রমে দুদকের সক্ষমতার বিষয়ে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, দুদকের সামর্থ্য প্রত্যাশিত মাত্রায় পৌঁছায়নি বলে একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে। তবে যৌক্তিক হবে প্রাধান্য নির্ধারণ করে নিজেদের কাজ এগিয়ে নেওয়া। এর মাধ্যমে তারা দৃষ্টান্ত স্থাপন এবং মানুষের আস্থা অর্জন করতে পারবে।সূত্র: প্রথম আলো


LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here