আপনার সন্তানকে স্মার্টফোন নই, বই হাতে তুলে দিন

0
99

মোজাম্মেল হক, কক্সবাজার সদরঃ   আপনার ঘরে পড়ে থাকা ল্যাপটপ,আইপ্যাড়,স্মার্টফোন এবং স্মার্ট টিভির মারাত্নক ভাইরাস থেকে আপনার আদরের সন্তানকে বাঁচান। এই সব ইলেকট্রনিক্স ডিভাইসে নেটওয়ার্ক এর মাধ্যমে গেমস, কার্টুন, ইউটিউব দেখা থেকে বিরত রাখুন।খাওয়ানোর অজুহাতে আপনার ছোট শিশুটির হাতে মোবাইল বা ট্যাব তুলে দেয়া এবং নিজেরা চাকরী করেন ব্যস্ত থাকেন তাই আপনার ছেলেকে সময় দিতে পারছেন না বলে বড় একটি ট্যাব কিনে নেট সহকারে ছেলে মেয়ের হাতে ধরিয়ে দিয়েছেন এতেই আপনি আপনার বাচ্ছার সর্বোচ্চ ক্ষতিটা করেছেন যার ফলে সে আসক্ত হতে বাধ্য হয়েছে।

বিআরটিসি হিসেবে বাংলাদেশে এখন প্রায় ৮ কোটি মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করছে। আর ইউনিসেফ এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী প্রতি তিন জন ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের মধ্যে রয়েছে একজন শিশু। প্রতি ৮ সেকেন্ডে একজন শিশু নতুন করে ইন্টারনেট ব্যবহার করা শিখছে। এর পরিনাম ইলেকট্রনিক আর ভার্চুয়াল জগতের সাথে মারাত্নকভাবে আসক্ত হচ্ছে তারা। বাস্তব মানুষদের সাথে তারা আর কথা বলতে পছন্দ করছে না। সমাজের বাস্তবতার সাথে তাদের কোন যোগসুত্র তৈরি হচ্ছে না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লাইক, কমেন্ট, শেয়ার একটি চমৎকার জঠিলতায় ফেলে দিয়েছে তাদের। পারফেক্ট সেলফি আর বিপদজনক সেলফি তুলে যোগাযোগ মাধ্যমে ফেমাস হওয়া এখন তাদের একমাত্র প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়েছে। আর লাইক, কমেন্টস,শেয়ার যখন চাওয়া পরিমাণ হচ্ছে না ডুবে যাচ্ছে হতাশা, হীনমন্যতা আর বিষন্নতায়। আর এতে কমে যাচ্ছে তাদের পড়ার আগ্রহ চিন্তাশক্তি, মেধাশক্তি আর কল্পনা শক্তি।  

ইন্টারনেট ব্যবহারে বাচ্চাদের কুফলঃ

★ সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হচ্ছেঃ
মোবাইলে, ল্যাপটপ এবং ট্যাবে গেমস, কার্টুন ও ইউটিউবে ব্যস্ত থাকায় পরিবার, আত্নীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব ও পাড়া প্রতিবেশিদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন হচ্ছে। বাস্তব কোন মানুষের সাথে কথা বলে তারা এখন স্বাচ্ছন্দ্যেবোধ করছে না। ফলে সৃষ্টি হচ্ছে পারিবারিক একটি বিশাল যোগাযোগ দূরত্ব। 

ভার্চুয়াল জগতে ধাবিত হচ্ছেঃদিন দিন ইলেকট্রনিক্স ডিভাইস ব্যবহার করতে করতে মন মানুষিকতা ভার্চুয়াল জগতের দিকে ধাবিত হচ্ছে। সামজিক বাস্তবতা থেকে বহুদুরে সরে যাচ্ছে তাদের মন মানুষিকতা।ফলে ভুলে যাচ্ছে সমাজের প্রতি,সমাজের মানুষের প্রতি, আত্নীয় স্বজনদের প্রতি, পরিবারের প্রতি তাঁর দায়িত্ব ও কর্তব্যের কথা। 

★ সামাজিক দক্ষতা বঞ্চিত হচ্ছেঃফেইসবুক, লাইক, শেয়ার করতে করতে তাঁদের সকল ধ্যান ধারণা এবং চ্যাটিং, হোয়াটসঅ্যাপ, ম্যাসেজিং করতে করতে ভর্চুয়াল জগতে নেশায় তাঁরা এমন ভাবে  আসক্ত হয়ে পড়েছে সামাজিক কোন জ্ঞান, দক্ষতা অর্জনের কোন সময় বা চেষ্টাই তাদের মাঝে পরিলক্ষিত হচ্ছে না। সৃষ্টি হচ্ছে সামাজিক অবক্ষয়। 

★ কমে যাচ্ছে বই পড়া মোবাইলে গেমস, ফেইসবুক চ্যাটিং, ইউটিউবে কার্টুন সরিয়ে নিয়েছে ছেলে মেয়েদের হাত থেকে বই। ইলেকট্রনিক্স ডিভাইস হাতে আসার পর থেকে টেবিলে বসে বই পড়া তাঁরা ভুলে যাচ্ছে। দিনের বেশ কিছু প্রয়োজনীয় সময়ে তারা মোবাইলে গেমস খেলে, ফেইসবুকে চ্যাটিং আর ইউটিউবে কার্টুন দেখে নষ্ট করে যা একজন উঠতি বয়সের ছেলে মেয়ের জন্য অত্যান্ত ক্ষতিকর। 

★ সৃষ্ট হচ্ছে নানান জঠিল রোগঃদিনের বেশির ভাগ সময় ইন্টারনেটের সংস্পর্শে থাকার ফলে বাড়ন্ত ছোট বাচ্ছদের সৃষ্টি হচ্ছে নানান জঠিল রোগ। ক্ষতি হচ্ছে শিশুর মেধা বিকাশে। অল্প বয়সে সম্মুখীন হচ্ছে মারাত্নক মানুষিক রোগে। ইন্টারনেট ব্যবহারের ফলে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের প্রভাব বেড়ে গিয়ে ব্রেইন স্ট্রোক করার সম্ভাবনা থাকে বেশি।           

★ বাড়ছে যৌনতার সম্পর্কঃইন্টারনেট ব্যবহার করার ফলে সল্প বয়সী ছেলে মেয়েরা লিপ্ত হচ্ছে নানান অপকর্মে। সম্পৃক্ত হচ্ছে নানান সেক্সুয়্যালিটি ওয়েবসাইটের সাথে। ফলে অল্প বয়সে ছেলে মেয়েরা আসক্ত হচ্ছে যৌনতায়। বাড়ছে বাল্য বিবাহ সৃষ্টি হচ্ছে সামাজিক অশান্তি।  

★ বাড়ছে আত্নহত্যাঃইন্টারনেটে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পরিচয় হয়ে অল্প বয়সে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ছে স্কুল কলেজে পড়ুয়া ছেলে মেয়েরা সেই প্রেমের পরিপূরতা না পেলে ছেলে মেয়েরা আবেগের বশে বেছে নিচ্ছে আত্নহত্যার সহজ পন্থা। ফলে অকালে ঝরে পড়ছে হাজার হাজার ছেলে মেয়েদের জীবন। তা ছাড়া প্রেমে ব্যার্থ হয়ে হাজার হাজার ছেলে বেছে নিচ্ছে মদ গাজা, ইয়াবা সহ নানান প্রাণনাশক মাদক যা একটি ছেলেকে ঠেলে দিচ্ছে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে।   

আপনার ছেলে মেয়েদের বাঁচাতে যা করণীয়ঃ

★  দেড় বছর সময় পর্যন্তআপনার শিশুকে কোন ইলেকট্রনিক্স ডিভাইস যেমনঃ স্মাার্টফোন, ল্যাপটপ,স্মার্ট টিভি, ট্যাব ইত্যাদি নেটওয়ার্ক সংযুক্ত কোন ডিভাইসের সামনে আনবেন না। 
★ স্মার্টফোন, স্মার্ট টিভি, ট্যাব, ল্যাপটপ ইত্যাদি চালিয়ে শিশুকে খাওয়ানোর অভ্যাস্ত করবেন না। 
★ দুই থেকে পাঁচ বছর বা টিনেজ বয়সের হলে শুধু মাত্র শেখার জন্য দৈনিক ১ ঘন্টা শিক্ষণীয় জিনিস দেখাতে বা শিখাতে পারেন তাও রা ১১ টার আগে। ঐ সময়ে বাবা মা কে পাশে থাকা জরুরী।
★ রাত ১১ টার পর আপনার ছেলে যাতে কোন ইলেকট্রনিক্স ডিভাইসের সামনে বা স্ক্রীনের সামনে না থাকে তা বাবা মা কে নিশ্চিত করতে হবে।  
★ স্কুল, কলেজ, প্রাইভেট শেষে আপনার ছেলে মেয়েরা অবসর সময় কিভাবে কাটাবে তার সঠিক ব্যবস্থা করুন। 
★ বই পড়া, শরীর চর্চা, সাংস্কৃতিক চর্চা বা মাঠে খেলতে যাওয়ার ব্যবস্থা করুন। 
★ আপনার ছেলে মেয়ে স্মার্টফোনে, ট্যাবে, ল্যাপটপে কতক্ষণ সময় পার করছে তার খেয়াল রাখা। 
★ ১৮ বছরের আগে আপনার ছেলে মেয়ে কে স্মার্টফোন কিনে দিবেন না। 
★ ঘরে শিশু থাকলে স্মার্টফোন, স্মার্ট টিভি, ল্যাপটপ, ট্যাব শিশুদের হাতের লাগালের বাইরে রাখুন। 
★ স্কুল কোন ধরণের স্মার্টফোন যাতে ব্যবহার করতে না পারে তার জন্য সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলুন যাতে স্কুলও আপনার ছেলে মেয়ে ভার্চুয়াল জগতের ভাইরাস থেকে বিরত থাকতে পারে। 
★ আসক্ত হওয়ার মত কোন সময় যাতে তার না  থাকে, একা থাকা বা একা ভাবতে দিবেন না তাদের কে। 
★ বকা ঝকা নই উদ্ধুদ্ধ করুন ভার্চুয়াল জগৎ থেকে ফেরাতে। আপনি হোন তাদের সবচেয়ে কাছের ও প্রথম বিশ্বস্ত বন্ধু।   ★ ঘরের কাজে সম্পৃক্ত করুন, খেলধূলা, বই পড়া ও সৃজনশীল কাজে উৎসাহিত করুন। 
★ নিজ নিজ ধর্মাবলম্বীরা তাদের নিজ নিজ ধর্ম শিক্ষা দিন এবং ধর্মীয় কাজে উৎসাহিত করুন। 
★ পরিবারের সবাই মিলে নানান পারিবারিক প্রোগ্রাম করুন এতে আপনার ছেলে মেয়েদের সাথে কমিনিউকেশন বাড়বে। 
★ আত্ন আসক্ত এই ভার্চুয়াল জগৎ থেকে বের করে নিয়ে আসার দায়িত্ব আপনার আমার।    


★ সন্তানকে শিক্ষা দেয়ার জন্য নিজেরা যথা সম্ভব ভার্চুয়াল জগৎ থেকে বিরত থাকার চেষ্টা করুন কারণ আপনার সন্তানেরা প্রতিটি মুহুর্তে আপনাদের অনুসরণ করছে। সুতরাং আপনাদের নিজেদের বদলাতে হবে। সন্তানদের দিকে তাকিয়ে নিজেদের সকল ভার্চুয়াল আসক্ত থেকে বিরত রাখুন আপনাদের সন্তানেরা নিজে নিজে সংশোধিত হয়ে যাবে।                                

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here